আফগান ধর্মীয় স্কুল-মসজিদে হামলা, নিহত ৮০

Sanatan Patra
আফগানিস্তানে ধর্মীয় স্কুল ও মসজিদে হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা
সনাতন পত্র রিপোর্টার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সনাতন পত্র
আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে একটি ধর্মীয় স্কুল ও সংলগ্ন মসজিদে পাকিস্তানের বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮০ জনে দাঁড়িয়েছে। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ভোরে এই হামলার ঘটনা ঘটে। আফগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় মুসল্লিরা রয়েছেন। হামলার পর থেকে আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে নিহতের সংখ্যা কম জানানো হলেও দুপুরের পর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে আরও মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ঘটনাস্থলে গুরুতর আহত অবস্থায় অন্তত ৬০ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী প্রদেশে অবস্থিত ওই ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভোরের নামাজ শেষে শিক্ষার্থীরা অবস্থান করছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আকস্মিকভাবে আকাশে যুদ্ধবিমান দেখা যায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। প্রথম আঘাতটি মসজিদের মূল ভবনে লাগে, এরপর সংলগ্ন শ্রেণিকক্ষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবনের একাংশ ধসে পড়ায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।

স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় নিহতদের অধিকাংশই কিশোর শিক্ষার্থী। কয়েকজন শিক্ষক ও মসজিদের ইমামও প্রাণ হারিয়েছেন। ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী দল ও স্বেচ্ছাসেবীরা দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের বের করার চেষ্টা চালান। সীমিত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে উদ্ধারকাজে বিলম্ব হয়েছে বলে জানা গেছে।

আফগান সরকারের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, এটি একটি বেসামরিক স্থাপনায় সরাসরি হামলা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। তিনি দাবি করেন, লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। হামলার ঘটনায় আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয়েছে।

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দেশটির নিরাপত্তা সূত্রগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছে। পাকিস্তান দাবি করছে, তারা নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী আস্তানাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে আফগান কর্তৃপক্ষ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত উত্তেজনা বিদ্যমান। বিশেষ করে দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সেই প্রেক্ষাপটে এই হামলা নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হামলার সময় আশপাশের বাড়িঘরেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বেশ কয়েকটি কাঁচা ঘর ধসে পড়েছে এবং জানালার কাচ ভেঙে গেছে। অনেক পরিবার আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে। শিশু ও নারীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেসামরিক স্থাপনায় হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে এবং হতাহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যদি প্রমাণিত হয় যে লক্ষ্যবস্তু একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল, তবে তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আহতদের চিকিৎসায় স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে রক্তের সংকট দেখা দিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো রক্তদানের আহ্বান জানিয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ আহত ব্যক্তি বিস্ফোরণের আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছেন এবং কয়েকজনের অঙ্গহানি ঘটেছে।

হামলার পর এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আফগান নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে এবং সম্ভাব্য দ্বিতীয় হামলার আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জনগণকে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত নিরাপত্তা ও জঙ্গি দমনে যৌথ আলোচনা চলছিল। তবে এই ঘটনার পর সেই আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

নিহতদের দাফনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায় সহিংসতা না বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের স্থানীয় কার্যালয় হতাহতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানা গেছে।

সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ৮০ জনে দাঁড়িয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ আটকে আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বজায় থাকবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
প্রকাশ: ১১:৩১, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৪৮, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top