১০ মার্চ চালু হচ্ছে পরীক্ষামূলক ফ্যামিলি কার্ড

Sanatan Patra
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সংক্রান্ত প্রতীকী ছবি
সনাতন পত্র রিপোর্টার
একাত্তর অনলাইন ডেস্ক
সনাতন পত্র
দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে দেশের ১৩টি উপজেলার ১৩টি ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘ফ্যামিলি কার্ড সংক্রান্ত কমিটি’র সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে দুটি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে তা সম্প্রসারণ করে ১৩টি উপজেলায় নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ত্রুটি রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনে অসঙ্গতি দেখা যায়, যার ফলে অর্থের অপচয় ও দ্বৈত সুবিধা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। নতুন ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবারকে কাঠামোবদ্ধভাবে সহায়তা দেওয়া হবে। সুবিধাভোগী নির্বাচনে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য ব্যবহার করা হবে। তবে শুধু কাগুজে তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করা হবে। উপকারভোগীদের চার শ্রেণিতে ভাগ করার প্রস্তাব রয়েছে—হতদরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। এই শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে সহায়তার পরিমাণ ও ধরন নির্ধারণ করা হবে।

অর্থ বিভাগের সচিব সভায় জানান, ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে বিদ্যমান খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, টিসিবি কার্ড এবং ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট’সহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প একীভূত করা হবে। ফলে একাধিক কার্ড ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি সমন্বিত কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে বলে মনে করছে সরকার।

নতুন ব্যবস্থায় সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই ব্যক্তি যেন একাধিক সুবিধা গ্রহণ করতে না পারেন, সে জন্য অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা ডাটাবেইসের সঙ্গে এই কার্ডের তথ্য আন্তঃসংযোগ করা হবে। ডিজিটাল যাচাই পদ্ধতির মাধ্যমে তথ্য মিলিয়ে নেওয়া হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সভায় জানান, একটি ফ্যামিলি কার্ডে একটি পরিবারের পাঁচজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একান্নবর্তী বা বৃহৎ পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য পৃথক কার্ডের ব্যবস্থা রাখা হবে। তবে একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা বা সহায়তা নিতে পারবেন না। কার্ডটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে সহায়তার অর্থ সরাসরি পরিবারের দায়িত্বপ্রাপ্ত নারীর হাতে পৌঁছায়।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা জানান, নারীকেন্দ্রিক বিতরণ ব্যবস্থার ফলে পরিবারভিত্তিক ব্যয় পরিকল্পনা ও শিশুদের কল্যাণমূলক খাতে অর্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে। এ ছাড়া নারী প্রধানের নামে কার্ড থাকলে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পাবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে যে ১৩টি ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্প শুরু হবে, তার মধ্যে রাজধানী ঢাকার গুলশান-১ সংলগ্ন কড়াইল বস্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পতেঙ্গা ও বাঞ্ছারামপুরকে নির্বাচন করা হয়েছে। এছাড়া পাংশা, লামা, খালিশপুর, চরফ্যাশন, দিরাই, ভৈরব, বগুড়া সদর, লালপুর, ঠাকুরগাঁও ও নবাবগঞ্জ উপজেলার নির্বাচিত ওয়ার্ডগুলোতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচিত এলাকায় পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে সম্ভাব্য উপকারভোগীর তালিকা চূড়ান্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদনের পর কার্ড বিতরণ শুরু হবে।

অনুদানের অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। নগদ অর্থ হাতে দেওয়ার পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেন করায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমবে বলে মনে করছে সরকার। একই সঙ্গে উপকারভোগীরা নিয়মিত লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণ করতে পারবেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পাইলট প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়ন করে পরবর্তী সময়ে সারা দেশে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। যদি পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে, তাহলে পর্যায়ক্রমে সব জেলা ও উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সভায় বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারের ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সঠিক ব্যক্তির কাছে সঠিক সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা জরুরি। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে তথ্যভিত্তিক ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ মার্চ উদ্বোধনের সময় কর্মসূচির নীতিমালা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে। উদ্বোধনের পরপরই নির্বাচিত এলাকাগুলোতে কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। যেকোনো অনিয়ম বা অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হটলাইন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের দাবি, ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা বাড়বে। একই সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে নিয়মিত সহায়তা প্রদান সহজ হবে। পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম 
...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top