শিবমহাগীতায় রাবণবধের ভবিষ্যদ্বাণী: রামের ঐশ্বরিক ভূমিকা

Sanatan Patra
Sanatan Puja 2026
শ্রীমদ্ শিবমহাগীতার পঞ্চম অধ্যায়ের পরবর্তী অংশে সর্বমোট ১৮ টি সংস্কৃত শ্লোক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা —

রাঘবোহয়ং চ তৈরস্ত্রৈ রাবণং নিহনিষ্যতি।
তস্মৈ দেবৈরবধ্যত্বমিতি দত্তো বরো ময়া।।১৮।।

শব্দার্থঃ —

- রাঘবঃ — রঘুবংশীয়, রাম।  
- অয়ম্ — এই।  
- চ — এবং।  
- তৈঃ অস্ত্রৈঃ — ঐ অস্ত্রসমূহ দ্বারা।  
- রাবণম্ — রাবণকে।  
- নিহনিষ্যতি — বিনাশ করিবে, বধ করিবে।  
- তস্মৈ — তাঁহাকে, রামকে।  
- দেবৈঃ — দেবতাগণের দ্বারা।  
- অবধ্যত্বম্ — অবধ্যতা, দেবতাগণের দ্বারা অজেয় হওয়া।  
- ইতি — এইরূপে।  
- দত্তঃ — প্রদান করা হইয়াছে।  
- বরঃ — বর, আশীর্বাদ।  
- ময়া — আমার দ্বারা, পরমেশ্বর শিবের দ্বারা।  

বঙ্গানুবাদঃ — “এই রাঘব রামচন্দ্র ঐ অস্ত্রসমূহ দ্বারা রাবণকে বিনাশ করিবে। তাঁহাকে অর্থাৎ রাবণকে দেবতাগণের দ্বারা অবধ্যতা এই বর আমি তাহাকে প্রদান করিয়াছি।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে দেবাধিদেব ঈশ্বর মহাদেব রামের ভবিষ্যৎ বিজয়ের ঘোষণা দিতেছেন। তিনি বলিতেছেন যে রাম ঐ ঐশ্বরিক অস্ত্রসমূহ দ্বারা রাবণকে বিনাশ করিবে। রাবণকে তিনি এমন বর প্রদান করিয়াছেন যে দেবতাগণের দ্বারা তিনি অবধ্য, অর্থাৎ তাঁহাকে কোনো দেবতা বধ করিতে পারিবেন না।  
এইখানে তিনটি বিষয় স্পষ্ট, যে রামের দিব্যশক্তি অর্থাৎ শিবপ্রদত্ত অস্ত্রসমূহ তাঁহাকে অজেয় করিয়াছে। 
রাবণের বিনাশ অর্থাৎ মহাজাগতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য রাবণকে বিনাশ করিবে রাজকুমার রাম। 
অবধ্যতার বর অর্থাৎ রাবণকে দেবতাগণের দ্বারা অজেয় করিয়াছিলেন পরমেশ্বর সদাশিব, এবং রামচন্দ্রকে মহাজাগতিক কর্তব্য পালনের জন্য প্রস্তুত করা হইয়াছে। এইভাবে শ্লোকটি রামের ঐশ্বরিক কর্তব্য, পরমেশ্বর শিবের করুণা এবং মহাজাগতিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক প্রসারিত হইয়াছে।

তস্মাদ্বানরতামেত্য ভবন্তো যুদ্ধদুর্মদাঃ।
সাহায্যমস্য কুর্বন্তু তেন সুস্থা ভবিষ্যথ।।১৯।।

শব্দার্থঃ —

- তস্মাত্ — সুতরাং, অতএব।  
- বানরতাম্ — বানরসেনারূপে।  
- এত্য — গমন করিয়া, উপস্থিত হইয়া।  
- ভবন্তঃ — তোমরা সকলেই।  
- যুদ্ধদুর্মদাঃ — যুদ্ধপ্রবণ, যুদ্ধক্লান্তিহীন, যুদ্ধবীর।  
- সাহায্যম্ — সাহায্য।  
- অস্য — তাঁহার, রামের।  
- কুর্বন্তু — করুক, প্রদান করুক।  
- তেন — তাহার দ্বারা।  
- সুস্থাঃ — কল্যাণপ্রাপ্ত, সুখী।  
- ভবিষ্যথ — হইবে, ভবিষ্যতে থাকিবে।

বঙ্গানুবাদঃ — “অতএব তোমরা সকলেই যুদ্ধবীর বানরসেনারূপে উপস্থিত হইয়া রামের সাহায্য করো। তাহার দ্বারা তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত ও সুখী হইবে।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে পরমেশ্বর সদাশিব দেবতাগণ ও অন্যান্য শক্তিধর প্রাণীদের উদ্দেশে আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি বলিতেছেন যে তাঁহারা বানরসেনারূপে অবতীর্ণ হইয়া রামের সাহায্য করুন। রামের সহায়তায় তাঁহাদের কল্যাণ ও সুখ নিশ্চিত হইবে। এইখানে তিনটি মূল প্রতীক প্রকাশ পাইতেছে, যে বানরসেনা অর্থাৎ ভক্ত ও সহযোগীদের প্রতীক, যাহারা রামের কাজে সহায়তা করে। রামের সাহায্য অর্থাৎ ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সহযোগিতা। সুস্থ হওয়া অর্থাৎ পরমেশ্বর শিবের কাজে অংশগ্রহণ করিলে কল্যাণ ও সুখ লাভ হইয়া থাকে। এইভাবে শ্লোকটি ভক্তদের শিক্ষা দেয় যে ঈশ্বর শিবের মহাজাগতিক মহালীলার কাজে সহযোগিতা করিলে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কল্যাণ নিশ্চিত হইয়া থাকে।

তদাজ্ঞাং শিরসা গৃহ্য সুরাঃ প্রাঞ্জলয়স্তথা।
প্রণম্য চরণৌ শম্ভোঃ স্বং স্বমস্ত্রং দদুর্মুদা।।২০।।

শব্দার্থঃ —

- তদ্ আজ্ঞাম্ — সেই আজ্ঞা, নির্দেশ।  
- শিরসা গৃহ্য — শিরে ধারণ করিয়া, মাথা নত করিয়া গ্রহণ করিয়া।  
- সুরাঃ — দেবগণ।  
- প্রাঞ্জলয়ঃ — প্রণামভরে, হাত জোড় করিয়া।  
- তথা — তদনুসারে, সেইভাবে।  
- প্রণম্য — প্রণাম করিয়া।  
- চরণৌ — পদযুগল।  
- শম্ভোঃ — পরমেশ্বর শিবশম্ভুর / দেবাধিদেব ঈশ্বর মহাদেব শঙ্করের।  
- স্বং স্বম্ — আপন আপন।  
- অস্ত্রং — অস্ত্র।  
- দদুঃ — দিলেন, প্রদান করিলেন।  
- মুদা — আনন্দভরে, প্রফুল্লচিত্তে।

বঙ্গানুবাদঃ — “দেবতাগণ মাথা নত করিয়া পরমেশ্বর শিবশম্ভুর আজ্ঞা গ্রহণ করিলেন। তাঁহারা ভক্তি সহকারে 
পদযুগল বন্দনা করিয়া আপন আপন অস্ত্র আনন্দভরে প্রদান করিলেন।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে দেবতাগণের শিবভক্তি ও আনুগত্য প্রকাশ পাইতেছে। পরমেশ্বর শিবের নির্দেশ তাঁহারা মাথা নত করিয়া গ্রহণ করিলেন, যাহা পরমেশ্বর শিবের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক। তাঁহারা প্রণাম করিয়া পরমেশ্বর শিবশম্ভুর পদযুগল বন্দনা করিলেন এবং আনন্দভরে আপন আপন অস্ত্র প্রদান করিলেন। এইখানে তিনটি বিষয় স্পষ্ট, আজ্ঞা গ্রহণ অর্থাৎ ঈশ্বরের নির্দেশ সর্বোচ্চ, ভক্ত ও দেবতাগণ তাহা বিনম্রচিত্তে গ্রহণ করেন। প্রণাম ও বন্দনা অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধার প্রকাশ পাইয়াছে। অস্ত্র প্রদান মানে দেবতাগণ নিজেদের শক্তি রামের হাতে অর্পণ করিলেন, যাহা মহাজাগতিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন। এইভাবে শ্লোকটি দেবতাগণের শিবভক্তি, পরমেশ্বর শিবের মহিমা এবং রামের দিব্যশক্তি লাভের এক মহিমান্বিত দৃশ্য প্রকাশ করিয়াছে।

নারায়ণাস্ত্রং দৈত্যারিরৈন্দ্রমস্ত্রং পুরন্দরঃ।
ব্রহ্মাপি ব্রহ্মদণ্ডাস্ত্রমাগ্নেয়াস্ত্রং ধনঞ্জয়ঃ।।২১।।

শব্দার্থঃ —

- নারায়ণাস্ত্রং — নারায়ণ প্রদত্ত দিব্য অস্ত্র।  
- দৈত্যারিঃ — দৈত্যদের শত্রু, অর্থাৎ ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণুদেব।  
- ঐন্দ্রম্ অস্ত্রং — ভগবান দেবরাজ ইন্দ্রের অস্ত্র, বজ্র।  
- পুরন্দরঃ — দেবরাজ ইন্দ্র।  
- ব্রহ্মা — সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাদেব।  
- ব্রহ্মদণ্ড অস্ত্রং — ব্রহ্মার দণ্ড নামক অস্ত্র।  
- আগ্নেয় অস্ত্রং — অগ্নিদেব প্রদত্ত অস্ত্র।  
- ধনঞ্জয়ঃ — ধনঞ্জয়, অর্থাৎ অগ্নিদেব।  

বঙ্গানুবাদঃ — “দৈত্যদের শত্রু ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণুদেব রাজকুমার রামকে নারায়ণাস্ত্র প্রদান করিলেন। পুরন্দর ইন্দ্র তাঁহাকে ঐন্দ্র অস্ত্র দিলেন। ব্রহ্মা ব্রহ্মদণ্ড অস্ত্র দিলেন, এবং অগ্নিদেব ধনঞ্জয় তাঁহাকে আগ্নেয় অস্ত্র প্রদান করিলেন।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে দেবতাগণের অস্ত্রপ্রদান বর্ণিত হইয়াছে। নারায়ণাস্ত্র অর্থাৎ বিষ্ণুর প্রদত্ত অস্ত্র, যাহা অসীম শক্তির প্রতীক। ঐন্দ্র অস্ত্র অর্থাৎ ইন্দ্রের বজ্র, দেবরাজের শক্তি ও বিজয়ের প্রতীক। ব্রহ্মদণ্ড অস্ত্র মানে ব্রহ্মার দণ্ড, সৃষ্টিশক্তি ও শাস্তির প্রতীক।  
আগ্নেয় অস্ত্র মানে অগ্নিদেবের অস্ত্র, শক্তি, শুদ্ধি ও ধ্বংসের প্রতীক। এইভাবে রাম সমগ্র দেবতাগণের শক্তি লাভ করিলেন। শ্লোকটি দেখায় যে রাবণবধ কেবলমাত্র রামের ব্যক্তিগত শক্তি নয়, বরং দেবশক্তির সম্মিলিত ঐক্যের ফল।

যাম্য যমোপি মোহাস্ত্রং রক্ষোরাজস্তথা দদৌ।
বরুণো বারুণং প্রাদাদ্বায়ব্যাস্ত্রং প্রভঞ্জনঃ।।২২।।

শব্দার্থঃ —

- যাম্য — যম প্রদত্ত অস্ত্র।  
- যমঃ অপি — যমও।  
- মোহাস্ত্রং — মোহাস্ত্র, বিভ্রম সৃষ্টিকারী অস্ত্র।  
- রক্ষোরাজঃ — রাক্ষসরাজ, এইখানে কুবের (যিনি রাক্ষসরাজ নামে পরিচিত)।  
- তথা দদৌ — তদ্রূপে দিলেন।  
- বরুণঃ — বরুণদেব।  
- বারুণম্ — বরুণ অস্ত্র / জলশক্তি সম্পর্কিত অস্ত্র।  
- প্রাদাত্ — প্রদান করিলেন।  
- বায়ব্য অস্ত্রং — বায়ু সম্পর্কিত অস্ত্র।  
- প্রভঞ্জনঃ — প্রভঞ্জন, অর্থাৎ বায়ু দেবতা।  

বঙ্গানুবাদঃ — “যম রামকে মোহাস্ত্র প্রদান করিলেন। রাক্ষসরাজ কুবেরও তাঁহাকে অস্ত্র দিলেন। বরুণ তাঁহাকে বারুণ অস্ত্র দিলেন, আর প্রভঞ্জন বায়ু তাঁহাকে বায়ব্য অস্ত্র প্রদান করিলেন।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে দেবতাগণের অস্ত্রপ্রদান অব্যাহতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। মোহাস্ত্র অর্থাৎ বিভ্রম সৃষ্টিকারী অস্ত্র, শত্রুকে বিভ্রান্ত করিবার ক্ষমতাসম্পন্ন।  
কুবেরের অস্ত্র মানে ঐশ্বর্য ও ধনসম্পদের প্রতীক।  
বারুণ অস্ত্র মানে জলশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অস্ত্র, শুদ্ধি ও প্রবাহের প্রতীক। বায়ব্য অস্ত্র অর্থাৎ বায়ুশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অস্ত্র, গতি ও শক্তির প্রতীক। এইভাবে রাম সমগ্র প্রকৃতির মৌলিক শক্তি, জল, বায়ু, বিভ্রম ও ঐশ্বর্য অর্থাৎ দেবতাগণের বরদানরূপে লাভ করিলেন। শ্লোকটি দেখায় যে রাবণবধের জন্য রামকে কেবলমাত্র  একা নয়, বরং সমগ্র দেবতাগণের সম্মিলিত দিব্যশক্তি প্রদান করিয়াছেন।  

কৌবেরং চ কুবেরোহপি রৌদ্রমীশান এব চ।
সৌরমস্ত্রং দদৌ সূর্যঃ সৌম্যং সোমশ্চ পার্বতম্।
বিশ্বদেবা দদুস্তস্মৈ বসবো বাসবাভিধম্।।২৩।।

শব্দার্থঃ —

- কৌবেরম্ — কুবের প্রদত্ত অস্ত্র।  
- চ কুবেরঃ অপি — এবং কুবেরও।  
- রৌদ্রম্ — রুদ্ররূপী অস্ত্র।  
- ঈশানঃ — ঈশান, পরমেশ্বর শিবের এক রূপ।  
- সৌরম্ অস্ত্রং — সূর্যের অস্ত্র।  
- দদৌ সূর্যঃ — সূর্য প্রদান করিলেন।  
- সৌম্যম্ — চন্দ্র প্রদত্ত অস্ত্র।  
- সোমঃ চ — সোম, অর্থাৎ চন্দ্র।  
- পার্বতম্ — পার্বত অস্ত্র, পর্বতের শক্তি সম্পর্কিত।  
- বিশ্বদেবাঃ — বিশ্বদেবগণ।  
- দদুঃ তস্মৈ — তাঁহাকে দিলেন।  
- বসবঃ — বসবগণ, অর্থাৎ অষ্ট বসু।  
- বাসবাভিধম্ — ইন্দ্রনামক অস্ত্র, ইন্দ্রের শক্তি সম্পর্কিত।

বঙ্গানুবাদঃ — “কুবের রামকে কৌবের অস্ত্র প্রদান করিলেন, ঈশান তাঁহাকে রৌদ্র অস্ত্র দিলেন। সূর্য সৌরম অস্ত্র দিলেন, সোম চন্দ্র সৌম্য অস্ত্র দিলেন, পার্বত অস্ত্রও প্রদান করা হইল। বিশ্বদেবগণ তাঁহাকে বসব অস্ত্র দিলেন, যাহা বাসব নামে পরিচিত।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে দেবতাগণের অস্ত্রপ্রদান আরও বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। কৌবের অস্ত্র অর্থাৎ  
ঐশ্বর্য ও ধনসম্পদের প্রতীক। রৌদ্র অস্ত্র অর্থাৎ রুদ্রশক্তির প্রতীক, ভয়ঙ্কর ধ্বংসশক্তি। সৌরম অস্ত্র অর্থাৎ সূর্যের শক্তি, আলোক ও তেজের প্রতীক। সৌম্য অস্ত্র অর্থাৎ চন্দ্রের শক্তি, শান্তি ও শীতলতার প্রতীক।  
পার্বত অস্ত্র অর্থাৎ পর্বতের শক্তি, স্থিতিশীলতা ও দৃঢ়তার প্রতীক। বসব অস্ত্র অর্থাৎ অষ্ট বসুর শক্তি, মহাজাগতিক ভারসাম্যের প্রতীক। এইভাবে রাম সমগ্র দেবতাগণের শক্তি লাভ করিলেন, যেমন ঐশ্বর্য, ধ্বংস, তেজ, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্য। শ্লোকটি দেখায় যে রাবণবধের জন্য রামকে কেবলমাত্র নিজস্ব শক্তি নয়, বরং সূর্য, চন্দ্র, কুবের, ঈশান, বিশ্বদেব প্রভৃতি সকল দেবতাগণ তাঁহাদের শক্তি প্রদান করিয়াছেন।

অথ তুষ্টঃ প্রণম্যেশং রামো দশরথাত্মজঃ।
প্রাঞ্জলিঃ প্রণতো ভূত্বা ভক্তিযুক্তো ব্যজিজ্ঞপত্।।২৪।।

শব্দার্থঃ —

- অথ — তখন, এরপর।  
- তুষ্টঃ — সন্তুষ্ট, আনন্দিত।  
- প্রণম্য — প্রণাম করিয়া।  
- ঈশম্ — ঈশ্বর মহাদেবকে, দেবাধিদেব ঈশ্বর মহাদেবকে।  
- রামঃ — রাম।  
- দশরথাত্মজঃ — দশরথের পুত্র।  
- প্রাঞ্জলিঃ — হাত জোড় করিয়া।  
- প্রণতঃ ভূত্বা — বিনম্র হইয়া, নতশিরে।  
- ভক্তিযুক্তঃ — ভক্তি সহকারে।  
- ব্যজিজ্ঞপত্ — বিনীতভাবে নিবেদন করিলেন, প্রশ্ন করিলেন।

বঙ্গানুবাদঃ — “অতঃপর আনন্দিত হইয়া দশরথপুত্র রামচন্দ্র পরমেশ্বর সদাশিবকে প্রণাম করিলেন। তিনি প্রাঞ্জল হইয়া ভক্তি সহকারে প্রণত হইয়া অতএব বিনীতভাবে নিবেদন করলেন।”

বঙ্গানুবাদঃ — এই শ্লোকে রামের ভক্তি ও বিনয় প্রকাশ পাইতেছে। দেবতাগণের অস্ত্রপ্রদান ও পরমেশ্বর মহাদেবের বরদান প্রাপ্তির পর রাম আনন্দিত হইলেন। তিনি পরমেশ্বর সদাশিবকে প্রণাম করিলেন, হাত জোড় করিয়া বিনম্রচিত্তে দাঁড়াইলেন এবং ভক্তি সহকারে পরমেশ্বর শিবের প্রতি নিবেদন করিলেন। এইখানে তিনটি বিষয় স্পষ্ট, রামের ভক্তি অর্থাৎ পরমেশ্বর শিবের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। বিনয় অর্থাৎ শক্তি ও বরদান প্রাপ্তির পরও অহংকার নয়, বরং বিনম্রতা।  
নিবেদন অর্থাৎ শিবভক্ত সর্বদা পরমেশ্বর শিবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়া থাকে। এইভাবে শ্লোকটি ভক্তি, বিনয় ও পরমেশ্বর শিবের প্রতি কৃতজ্ঞতার এক মহিমান্বিত দৃশ্য প্রকাশ করিয়াছে।

শ্রীরাম উবাচ
ভগবন্মানুষেণৈব নোল্লঙ্ঘ্যো লবণাম্বুধিঃ।
তত্র লঙ্কাভিদ্যং দুর্গং দুর্জয়ং দেবদানবৈ।।২৫।।

শব্দার্থঃ —

- শ্রীরাম উবাচ — শ্রীরাম বলিলেন।  
- ভগবন্ — হে পরমেশ্বর সদাশিব।  
- মানুষেণ এভ — কেবলমাত্র মানুষ দ্বারা।  
- ন উল্লঙ্ঘ্যঃ — অতিক্রমযোগ্য নয়, পার হওয়া যায় না।  
- লবণাম্বুধিঃ — লবণসমুদ্র, অর্থাৎ সাগর।  
- তত্র — সেখানে।  
- লঙ্কা অভিদ্যম্ দুর্গম্ — লঙ্কার দুর্গ, অতি দুর্গম।  
- দুর্জয়ম্ — জয় করা কঠিন।  
- দেবদানবৈঃ — দেবতা ও দানবদের দ্বারাও।

বঙ্গানুবাদঃ — “শ্রীরাম বলিলেন, হে পরমেশ্বর সদাশিব! কেবলমাত্র মানুষ দ্বারা এই লবণসমুদ্র অতিক্রমযোগ্য নয়। সেখানে লঙ্কার দুর্গ অবস্থিত রহিয়াছে, যাহা দেবতা ও দানবদের পক্ষেও দুর্জয়।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে রাজকুমার রাম পরমেশ্বর মহাদেবকে নিবেদন করিতেছেন যে লঙ্কার দুর্গে পৌঁছানো সহজ নয়। লবণসমুদ্র অর্থাৎ পৃথিবীর সীমা ও প্রতিবন্ধকতার প্রতীক। মানুষ দ্বারা অতিক্রম অযোগ্য অর্থাৎ তাহাতে মানবশক্তি সীমিত, কেবলমাত্র ঐশ্বরিক সহায়তা ছাড়া মহাজাগতিক কর্তব্য সম্পাদন সম্ভব নয়। লঙ্কার দুর্গ অর্থাৎ রাবণের শক্তির কেন্দ্র, যাহা দেবতা ও দানবদের পক্ষেও জয় করা কঠিন। এইখানে রামের বিনয় প্রকাশ পাইতেছে। তিনি স্বীকার করিতেছেন যে মানবশক্তি দ্বারা এই মহাজাগতিক কর্তব্য সম্পাদন সম্ভব নয়, ঈশ্বরীয় সহায়তা অপরিহার্য।  

অনেককোটয়স্তত্র রাক্ষসা বলবত্তরাঃ।
সর্বে স্বাধ্যায়নিরতাঃ শিবভক্তা জিতেন্দ্রিয়াঃ।।২৬।।

শব্দার্থঃ —

- অনেককোটয়ঃ — অসংখ্য কোটি।  
- তত্র — সেখানে।  
- রাক্ষসাঃ — রাক্ষসগণ।  
- বলবত্তরাঃ — অত্যন্ত শক্তিশালী।  
- সর্বে — সকলেই।  
- স্বাধ্যায়নিরতাঃ — স্বাধ্যায় নিয়োজিত / বেদপাঠে নিয়োজিত।  
- শিবভক্তাঃ — শিবভক্ত, পরমেশ্বর মহাদেবের উপাসক।  
- জিতেন্দ্রিয়াঃ — ইন্দ্রিয় জয়ী, আত্মসংযমী।  

বঙ্গানুবাদঃ — “সেখানে অসংখ্য কোটি রাক্ষস বাস করিতেছিল, যাহারা অত্যন্ত শক্তিশালী। সকলেই স্বাধ্যায়নিরত, শিবভক্ত এবং ইন্দ্রিয় জয়ী ছিলেন।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে লঙ্কার রাক্ষসগণের প্রকৃতি বর্ণিত হইয়াছে। তাঁহারা অসংখ্য কোটি সংখ্যায় ছিলেন, অর্থাৎ বিপুল রাক্ষসবাহিনী। তাঁহারা বলবত্তর অর্থাৎ শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন।  
তাঁহারা স্বাধ্যায়নিরত, অর্থাৎ বেদপাঠ ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁহারা শিবভক্ত, অর্থাৎ পরমেশ্বর মহাদেবের উপাসক। তাঁহারা জিতেন্দ্রিয়, অর্থাৎ আত্মসংযমী ও ইন্দ্রিয় জয়ী। এইখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পাইতেছে অর্থাৎ, রাবণের অধীনস্থ রাক্ষসগণ কেবলমাত্র শক্তিশালী যোদ্ধাই ছিলেন না, তাঁহারা আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত ও শিবভক্তও ছিলেন। অর্থাৎ তাঁহাদের শক্তি কেবলমাত্র শারীরিক নয়, বরং আধ্যাত্মিক ভক্তি ও সংযম দ্বারা সমৃদ্ধ। এইভাবে শ্লোকটি লঙ্কার দুর্গমতা ও রাবণের বাহিনীর ভয়ঙ্কর শক্তির বর্ণনা করিতেছে, যাহা দেবতা ও দানবদের পক্ষেও দুর্জয়।

অনেকমায়াসংযুক্তা বুদ্ধিমন্তোহগ্নিহোত্রিণঃ।
কথমেকাকিনা জেয়া ময়া ভ্রাতা চ সংযুগে।।২৭।।

শব্দার্থঃ —

- অনেকমায়া-সংযুক্তাঃ — নানাবিধ মায়াযুক্ত, বিভ্রম সৃষ্টিকারী শক্তিধর।  
- বুদ্ধিমন্তঃ — জ্ঞানী, চতুর।  
- অগ্নিহোত্রিণঃ — অগ্নিহোত্র যজ্ঞকারী, আচারানুষ্ঠান পালনকারী।  
- কথম্ — কিরূপে, কীভাবে।  
- একাকিনা — একাকী অবস্থায়।  
- জেয়াঃ — জয় করা সম্ভব।  
- ময়া — আমার দ্বারা।  
- ভ্রাতা — ভ্রাতা, ভাই।  
- চ — এবং।  
- সংযুগে — যুদ্ধে, সংঘর্ষে।

বঙ্গানুবাদঃ — “সেখানে অসংখ্য মায়ায় জড়িত, বুদ্ধিমান, হোমযজ্ঞকারী ধর্মপরায়ণ রাক্ষস রহিয়াছে। কিন্তু আমি একা, কিভাবে তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হইবো, আর আমার ভ্রাতাও আমার সাথে সেই যুদ্ধে রহিয়াছে।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে রাজকুমার রামচন্দ্র পরমেশ্বর সদাশিবকে নিবেদন করিতেছেন যে লঙ্কার রাক্ষসগণ কেবলমাত্র শক্তিশালীই নন, তাঁহারা নানাবিধ মায়াশক্তিতে সমৃদ্ধ, জ্ঞানী এবং আচারানুষ্ঠান পালনকারী, আর ধর্মপরায়ণও। অর্থাৎ তাঁহাদের শক্তি কেবলমাত্র শারীরিক নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও মায়াশক্তির দ্বারা সমৃদ্ধ। রাম বিনয়ের সঙ্গে বলিতেছেন, হে পরমেশ্বর সদাশিব! যে আমি একাকী অবস্থায় এই কঠিন যুদ্ধে কিভাবে জয় হইবো। অর্থাৎ রামচন্দ্র বলিতেছেন যে একাকী অবস্থায় তিনি কিরূপে এত শক্তিধর রাক্ষস এবং রাবণকে জয় করিবেন। এইখানে রামের বিনয় ও ঈশ্বরীয় সহায়তার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ পাইতেছে। মায়াশক্তি অর্থাৎ বিভ্রম ও অলৌকিক শক্তির প্রতীক। অগ্নিহোত্র অর্থাৎ আচারানুষ্ঠান ও ধর্মপালনের প্রতীক। রামের বিনয় অর্থাৎ ভক্ত সর্বদা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সহায়তা কামনা করিয়া থাকে। এইভাবে শ্লোকটি দেখায় যে রাবণ ও রাক্ষসগণ কেবলমাত্র শক্তিশালী নয়, বরং আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ, এবং তাঁহাদের জয় করা মানবশক্তি দ্বারা সম্ভব নয়, বরং ঈশ্বরীয় সহায়তা অপরিহার্য।

শ্রীমহাদেব উবাচ
রাবণস্য বধে রাম রক্ষসামপি মারণে।
বিচারো ন ত্বয়া কার্যস্তস্য কালীহয়মাগতঃ।।২৮।।

শব্দার্থঃ —

- শ্রীমহাদেব উবাচ — দেবাধিদেব ঈশ্বর শ্রীমহাদেব বলিলেন।  
- রাবণস্য — রাবণের।  
- বধে — বধে, বিনাশে।  
- রাম — হে রাম।  
- রক্ষসাম্ অপি — রাক্ষসদেরও।  
- মারণে — বিনাশে।  
- বিচারঃ — চিন্তা, ভাবনা।  
- ন ত্বয়া কার্যঃ — তোমার দ্বারা করণীয় নয়, তোমার ভাবনা করা উচিত নয়।  
- তস্য — তাহার।  
- কালী — মৃত্যুর কালের নিয়তি / ভবতারিণী মাতা কালী দেবী
- অয়ম্ আগতঃ — এই উপস্থিত হইয়াছেন, আগমন করিয়াছেন।

বঙ্গানুবাদঃ — “দেবাধিদেব ঈশ্বর শ্রীমহাদেব বলিলেন, হে রাম! রাবণের বধ এবং রাক্ষসদের বিনাশ বিষয়ে তোমার কোনো চিন্তা করিবার প্রয়োজন নাই। কারণ তাহাদের মৃত্যুর কালের নিয়তি ইতিমধ্যেই উপস্থিত হইয়াছেন।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে পরমেশ্বর মহাদেব রামকে আশ্বস্ত করিতেছেন। তিনি বলিতেছেন যে রাবণ ও রাক্ষসদের বিনাশ বিষয়ে রামের কোনো দুশ্চিন্তা করিবার প্রয়োজন নাই, কারণ মৃত্যুর কালের নিয়তি অর্থাৎ মাতা ভবতারিণী কালী দেবীর শক্তি নিজেই আগমন করিয়াছেন। রাবণবধ অর্থাৎ মহাজাগতিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। রাক্ষস বিনাশ অর্থাৎ ধর্মরক্ষার জন্য অধার্মিকদের বিনাশ অপরিহার্য এবং প্রয়োজনীয়। কালী দেবীর শক্তির আগমন মহাশক্তির প্রকাশ, যিনি নিজেই অধর্ম বিনাশ করিতে অবতীর্ণ হন।  
এইখানে বার্তা স্পষ্ট, যে ঈশ্বরীয় শক্তি সর্বদা ধর্মরক্ষার জন্য উপস্থিত হইয়া থাকেন। রামের কর্তব্য কেবলমাত্র শিবভক্তি ও আত্মসমর্পণ, এবং দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, বাকিটা ঐশ্বরিকশক্তি সম্পন্ন করিবেন।

অধর্মে তু প্রবৃত্তাস্তে দেবব্রাহ্মণপীডনে।
তস্মাদায়ুঃ ক্ষয় যাতং তেষাং শ্রীরপি সুব্রত।।২৯।।

শব্দার্থঃ —

- অধর্মে — অধর্মে, অন্যায় কাজে।  
- তু — কিন্তু, তবে।  
- প্রবৃত্তাঃ — নিযুক্ত, প্রবৃত্ত।  
- তে — তাহারা।  
- দেব-ব্রাহ্মণ-পীডনে — দেবতা ও ব্রাহ্মণদের পীড়নে, অত্যাচারে।  
- তস্মাত্ — সুতরাং।  
- আয়ুঃ — আয়ু, জীবনকাল।  
- ক্ষয় যাতম্ — ক্ষয়প্রাপ্ত, বিনাশের পথে।  
- তেষাম্ — তাহাদের।  
- শ্রীঃ অপি — ঐশ্বর্যও।  
- সুব্রত — হে সুব্রত (এইখানে রামকে সম্বোধন)।  

বঙ্গানুবাদঃ — “কিন্তু হে সুব্রত রাম! তাহারা অধর্মে প্রবৃত্ত হইয়া দেবতা ও ব্রাহ্মণদের পীড়ন করিতেছে। সুতরাং তাহাদের আয়ু ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়াছে এবং ঐশ্বর্যও বিনাশের পথে গিয়াছে।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে পরমেশ্বর মহাদেব রামকে আশ্বস্ত করিতেছেন। তিনি বলিতেছেন যে রাবণ ও রাক্ষসগণ যদিও শক্তিশালী, তবুও তাঁহারা অধর্মে প্রবৃত্ত হইয়াছে। দেবতা ও ব্রাহ্মণদের পীড়ন করিবার ফলে তাঁহাদের আয়ু ও ঐশ্বর্য ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়াছে।  
অধর্মে প্রবৃত্তি অর্থাৎ ও ধর্মবিরুদ্ধ কাজে নিযুক্ত হওয়া।  
দেব-ব্রাহ্মণ-পীড়ন অর্থাৎ ধর্মরক্ষক ও আধ্যাত্মিক শক্তির উপর অত্যাচার। আয়ুক্ষয় অর্থাৎ জীবনশক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়া। ঐশ্বর্য বিনাশ অর্থাৎ ধন, ক্ষমতা ও মহিমা ধ্বংসের পথে যাওয়া। এইখানে বার্তা স্পষ্ট, যে ব্যক্তি বা জাতি অধর্মে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে, সেই যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাহার আয়ু ও ঐশ্বর্য ধ্বংসের পথে যায়। ধর্মই প্রকৃত রক্ষাকবচ।

রাজস্ত্রীকামনাসক্তং রাবণং নিহনিষ্যসি।
পাপসক্তো রিপুর্জেতুং সুকরঃ সমরাঙ্গণে।।৩০।।

শব্দার্থঃ—

- রাজস্ত্রী-কামনা-আসক্তম্ — রাজস্ত্রী অর্থাৎ রাজনারী (সীতা), তাহার কামনায় আসক্ত, আসক্তিপূর্ণ।  
- রাবণম্ — রাবণকে।  
- নিহনিষ্যসি — তুমি বিনাশ করিবে, বধ করিবে।  
- পাপসক্তঃ — পাপে আসক্ত, অধর্মে নিমগ্ন।  
- রিপুঃ — শত্রু।  
- জেতুম্ — জয় করিতে।  
- সুকরঃ — সহজ, সহজসাধ্য।  
- সমরাঙ্গণে — যুদ্ধক্ষেত্রে।

বঙ্গানুবাদঃ — “হে রাম! রাজনারীর কামনায় আসক্ত রাবণকে তুমি বিনাশ করিবে। যে শত্রু পাপে আসক্ত, তাহাকে যুদ্ধক্ষেত্রে জয় করা সহজসাধ্য।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে দেবাধিদেব ঈশ্বর 
মহাদেব রামকে আশ্বস্ত করিতেছেন। তিনি বলিতেছেন যে রাবণ রাজনারী সীতার কামনায় আসক্ত হইয়া অধর্মে নিমগ্ন হইয়াছেন। পাপে আসক্ত শত্রুকে জয় করা সহজ, কারণ অধর্মে নিমগ্ন ব্যক্তি নিজের ধর্মশক্তি হারায়। রাবণের আসক্তি অর্থাৎ সীতার প্রতি কামনা তাঁহাকে অধর্মে নিমগ্ন করিয়াছে। পাপসক্তি অর্থাৎ পাপে নিমগ্ন হওয়া মানে আত্মশক্তি ক্ষয় হওয়া।  
যুদ্ধক্ষেত্রে জয় অর্থাৎ ধর্মপালনকারী শিবভক্তের জন্য অধর্মে আসক্ত শত্রুকে জয় করা সহজ। এইখানে বার্তা স্পষ্ট, যে অধর্মে আসক্ত ব্যক্তি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সেই সহজেই বিনাশপ্রাপ্ত হয়। ধর্মই প্রকৃত শক্তি, আর শিবভক্তের বিজয় কেবলমাত্র ধর্মশক্তির বলেই নিশ্চিত।

অধর্মে নিরতঃ শত্রুর্ভাগ্যেনৈব হি লভ্যতে।
অধীতধর্মশাস্ত্রোহপি সদা বেদরতোহপিবা।
বিনাশকালে সংপ্রাপ্তে ধর্মমার্গাচ্চ্যুতো ভবেত্।।৩১।।

শব্দার্থঃ —

- অধর্মে — অধর্মে, অন্যায় কাজে।  
- নিরতঃ — নিযুক্ত, নিমগ্ন।  
- শত্রুঃ — শত্রু।  
- ভাগ্যেন এভ হি লভ্যতে — ভাগ্যের দ্বারা অবশ্যই প্রাপ্ত হয়, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।  
- অধীত-ধর্ম-শাস্ত্রঃ — ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়নকারী।  
- অপি — যদিও।  
- সদা — সর্বদা।  
- বেদ-রতঃ অপি — বেদে নিযুক্ত, বেদপাঠে রত হলেও।  
- বিনাশকালে সংপ্রাপ্তে — বিনাশকাল উপস্থিত হলে।  
- ধর্ম-মার্গাৎ চ্যুতঃ ভবেত্ — ধর্মপথ হইতে বিচ্যুত হয়।

বঙ্গানুবাদঃ — “যে শত্রু অধর্মে নিমগ্ন, সেই ভাগ্যের দ্বারা অবশ্যই বিনাশপ্রাপ্ত হয়। যদিও সেই ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়নকারী এবং সর্বদা বেদপাঠে রত হইয়া থাকে, তথাপি বিনাশকাল উপস্থিত হইলে সেই ধর্মপথ হইতে বিচ্যুত হইয়া থাকে।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে পরমেশ্বর মহাদেব রামের প্রতি গভীর সত্য প্রকাশ করিতেছেন। অধর্মে নিমগ্ন শত্রু অর্থাৎ যে ব্যক্তি অন্যায় ও ধর্মবিরুদ্ধ কাজে লিপ্ত, তাহার পতন অবশ্যম্ভাবী। ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়নকারী হইলেও অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন বা বেদপাঠে রত থাকিলেও, যদি অন্তরে অধর্মে আসক্ত থাকে তবে তাহার প্রকৃত ধর্মরক্ষা হয় না। বিনাশকাল মানে যখন ধ্বংসের সময় উপস্থিত হয়, তখন সেই ধর্মপথ হইতে বিচ্যুত হয় এবং তাহার পতন ঘটে।  
এইখানে বার্তা স্পষ্ট, যে ধর্মের বাহ্যিক আচার পালন করিলেই যথেষ্ট নয়, অন্তরে ধর্মে স্থিত থাকা আবশ্যক। অধর্মে আসক্ত ব্যক্তি যতই জ্ঞানী বা আচারানুষ্ঠান পালনকারী হোক না কেন, ভাগ্যের নিয়মে তাহার পতন নিশ্চিত।

পীড্যন্তে দেবতাঃ সর্বাঃ সততং যেন পাপিনা।
ব্রাহ্মণাঋষয়শ্চৈব তস্য নাশঃ স্বয়ং স্থিতঃ।।৩২।।

শব্দার্থঃ —

- পীড্যন্তে — পীড়িত হন, অত্যাচারিত হন।  
- দেবতাঃ সর্বাঃ — সকল দেবতা।  
- সততং — সর্বদা, নিরন্তর।  
- যেন — যাহার দ্বারা।  
- পাপিনা — পাপিষ্ঠ, অধর্মে নিমগ্ন ব্যক্তি।  
- ব্রাহ্মণাঃ — ব্রাহ্মণগণ।  
- ঋষয়ঃ চ এভ — ঋষিগণও।  
- তস্য — তাহার।  
- নাশঃ — বিনাশ, ধ্বংস।  
- স্বয়ং স্থিতঃ — স্বয়ং প্রতিষ্ঠিত, অবধারিত, নিশ্চিত।  

বঙ্গানুবাদঃ — “যে পাপিষ্ঠ ব্যক্তি সর্বদা দেবতা, ব্রাহ্মণ এবং ঋষিদের পীড়ন করিয়া থাকে, তাহার বিনাশ স্বয়ং অবধারিত ও নিশ্চিতভাবে স্থির হইয়া থাকে।”

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ — এই শ্লোকে দেবাধিদেব ঈশ্বর মহাদেব রামকে এক মহাজাগতিক সত্য প্রকাশ করিতেছেন। দেবতা, ব্রাহ্মণ ও ঋষিদের পীড়ন অর্থাৎ ধর্মরক্ষক ও আধ্যাত্মিক শক্তির উপর অত্যাচার করা। 
পাপিষ্ঠ ব্যক্তি অর্থাৎ অধর্মে নিমগ্ন, অন্যায়কারী। 
বিনাশ অবধারিত অর্থাৎ যে ব্যক্তি ধর্মরক্ষকদের উপর অত্যাচার করে, তাহার পতন ও বিনাশ নিশ্চিত। এইখানে বার্তা স্পষ্ট, যে ধর্মরক্ষক দেবতা, ব্রাহ্মণ ও ঋষিদের উপর অত্যাচারকারী ব্যক্তি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাহার বিনাশ অবধারিত। ধর্মের শক্তি সর্বদা অধর্মকে ধ্বংস করিয়া থাকে।

কিষ্কিন্ধানগরে রাম দেবানামংশসম্ভবাঃ।
বানরা বহবো জাতা দুর্জয়া বলবত্তরাঃ।।৩৩।।

শব্দার্থঃ —

- কিষ্কিন্ধানগরে — কিষ্কিন্ধা নগরে।  
- রাম — হে রাম।  
- দেবানাম্ অংশ-সম্ভবাঃ — দেবতাদের অংশ থেকে জন্মগ্রহণকারী।  
- বানরাঃ — বানরগণ।  
- বহবঃ — অনেক, অসংখ্য।  
- জাতাঃ — জন্মগ্রহণ করিয়াছে।  
- দুর্জয়াঃ — দুর্জয়, জয় করা কঠিন।  
- বলবত্তরাঃ — অত্যন্ত শক্তিশালী।

বঙ্গানুবাদঃ — “হে রাম! কিষ্কিন্ধা নগরে দেবতাদের অংশ থেকে অসংখ্য বানর জন্মগ্রহণ করিয়াছে। তাঁহারা দুর্জয় এবং অত্যন্ত শক্তিশালী।”
...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top