নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যে স্বপ্নযাত্রার সূচনা হয়েছিল এক দশক আগে, তাতে আকস্মিক ছেদ পড়ার উপক্রম হয়েছে। গত বুধবার বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে। এই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপকে সহজভাবে দেখছেন না দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই পরিস্থিতিকে ‘ক্রাইসিস বাটন’ টেপার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে এমন এক জরুরি সংকেত পাঠিয়েছে যা সাধারণত চরম সংকটের মুহূর্তে ব্যবহৃত হয়।
আসন্ন সোমবার থেকে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) পাঁচ দিনব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই বৈঠকেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের এই আবেদনকে জাতিসংঘ কীভাবে মূল্যায়ন করবে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য নিজে এই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে যোগ দিতে আজ রাতে নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন। তিনি সিডিপির এনহ্যান্স মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) উপকমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এই আবেদন কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক চিঠি নয়, বরং দেশের ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি দালিলিক বহিঃপ্রকাশ।
অন্যদিকে, উত্তরণ পিছিয়ে দিলে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা (GSP) আরও কয়েক বছর ভোগ করা যাবে, যা হয়তো তৈরি পোশাক শিল্পের মতো রপ্তানি খাতের জন্য সাময়িক স্বস্তি দেবে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা না বাড়িয়ে কেবল সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে পরনির্ভরশীল করে তুলবে। শেষ পর্যন্ত সিডিপির মূল্যায়ন কী হয় এবং বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের এই ‘ক্রাইসিস বাটন’ টেপাকে কীভাবে গ্রহণ করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার গোলকধাঁধায় আটকে গেছে।
আসন্ন সোমবার থেকে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) পাঁচ দিনব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই বৈঠকেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের এই আবেদনকে জাতিসংঘ কীভাবে মূল্যায়ন করবে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য নিজে এই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে যোগ দিতে আজ রাতে নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন। তিনি সিডিপির এনহ্যান্স মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) উপকমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এই আবেদন কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক চিঠি নয়, বরং দেশের ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি দালিলিক বহিঃপ্রকাশ।
হঠাৎ কেন এই নাটকীয় ‘ইউ-টার্ন’?
আগেকার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে চূড়ান্তভাবে বের হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং দেশের অভ্যন্তরে চলমান চরম অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার অজুহাতে বর্তমান সরকার ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় বৃদ্ধির অনুরোধ জানিয়েছে। এখানে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—গত নভেম্বর মাসেও তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে বাংলাদেশ উত্তরণের জন্য শতভাগ প্রস্তুত। অথচ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বর্তমান সরকার কেন এই ইউ-টার্ন নিল? ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর পাঠানো চিঠিতে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ থাকলেও এর পেছনে গভীর কোনো রাজনৈতিক বা কাঠামোগত দুর্বলতা লুকিয়ে আছে কি না, তা এখন জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণের বিষয়।‘ক্রাইসিস বাটন’ এবং সলোমন আইল্যান্ডসের তিক্ত উদাহরণ
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, ইএমএম কাঠামোর অধীনে ‘ক্রাইসিস বাটন’ ব্যবহারের সুযোগ থাকে তখনই, যখন কোনো দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গৃহযুদ্ধ বা অভাবিত সামাজিক অস্থিরতার কারণে খাদের কিনারে চলে যায়। এর আগে সলোমন আইল্যান্ডস ভয়াবহ সুনামির ক্ষয়ক্ষতি এবং সামাজিক অস্থিরতার কারণে এই সুযোগ নিয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি আসলেই সেরকম কোনো ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? সরকারের এই সিদ্ধান্ত নেপাল ও লাওসের মতো একই কাতারে থাকা দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নেপাল ও লাওস যেখানে তাদের উত্তরণ প্রক্রিয়া যথাসময়ে সম্পন্ন করার পথে অনড় রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের পিছিয়ে যাওয়া দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।উত্তরণের মানদণ্ড এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশ ২০১৮ এবং ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকেই অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান আবেদনের ফলে সেই দীর্ঘদিনের অর্জনগুলো এখন গভীর অনিশ্চয়তা ও পুনঃমূল্যায়নের মুখে। যদি জাতিসংঘ এই আবেদন গ্রহণ করে, তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে আন্তর্জাতিক মর্যাদা এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণ করার ক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে যাবে।অন্যদিকে, উত্তরণ পিছিয়ে দিলে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা (GSP) আরও কয়েক বছর ভোগ করা যাবে, যা হয়তো তৈরি পোশাক শিল্পের মতো রপ্তানি খাতের জন্য সাময়িক স্বস্তি দেবে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা না বাড়িয়ে কেবল সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে পরনির্ভরশীল করে তুলবে। শেষ পর্যন্ত সিডিপির মূল্যায়ন কী হয় এবং বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের এই ‘ক্রাইসিস বাটন’ টেপাকে কীভাবে গ্রহণ করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার গোলকধাঁধায় আটকে গেছে।
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৮:৩০
...