নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো ২০২৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক অবস্থানে জামায়াতে ইসলামী কখনো শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়নি। ফলে এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ডা. শফিকুর রহমান বর্তমানে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।
রাষ্ট্রীয় আচার ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পর উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "এবার রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে এটি আমার দায়িত্ব। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে আমাকে আমার সঙ্গীদের নিয়ে আসতে হয়েছে, তাই আমি এসেছি।" তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় বিরোধীদলীয় নেতার যে প্রটোকল ও দায়িত্ব রয়েছে, তারই অংশ হিসেবে তিনি আজ শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়েছেন। উল্লেখ্য, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে এককভাবে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করেছে। তাদের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের মোট আসন সংখ্যা বর্তমানে ৭৭টি।মোনাজাত ও শ্রদ্ধা নিবেদন
শনিবার প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে শহীদ বেদিতে ফুল দেন শফিকুর রহমান। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও মুজিবুর রহমান। এছাড়াও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ শীর্ষ নেতারা এই মিছিলে অংশ নেন। ফুল দেওয়ার পর তারা শহীদ মিনারের মূল বেদিতে দাঁড়িয়ে ভাষাশহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। এটি ছিল দলটির পক্ষ থেকে এক ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।পুরানো বিতর্ক ও আমিরের অবস্থান
জামায়াতে ইসলামী অতীতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে 'অনৈসলামিক' বা 'অপ্রয়োজনীয়' হিসেবে গণ্য করত। এই বিষয়ে সাংবাদিকদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে পড়েন আমির। যখন এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন যে, জামায়াত কি এখনো ফুল দেওয়াকে নাজায়েজ মনে করে কিনা, তখন শফিকুর রহমান কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে পাল্টা প্রশ্ন করেন, "এ ধরনের প্রশ্ন আপনি কেন আজকে করছেন?" তিনি আরও জানান, তারা কেবল ভাষাশহীদ নয়, বরং ৪৭-এর দেশভাগ থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং গত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হওয়া সবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা পোষণ করেন। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের অবদানের কথা তিনি আলাদাভাবে স্মরণ করেন।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
জামায়াত আমিরের এই পদক্ষেপের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এক পক্ষ বিষয়টিকে জামায়াতের আধুনিকায়ন এবং গণতান্ত্রিক ধারায় মানিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। অন্য পক্ষ দলটির পূর্ববর্তী কঠোর ধর্মীয় অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে একে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বর্ণনা করছেন। দলটির ফেসবুক পেজে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল যে, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাবেন। তবে দলীয়ভাবে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল না।উপসংহার: ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
শহীদ মিনারে জামায়াত আমিরের এই উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ সময় কোণঠাসা হয়ে থাকার পর সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তাদের এই অংশগ্রহণ এবং জাতীয় দিবসের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়া একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে। উস্কানিমূলক আলোচনা বা বিতর্ক থাকলেও, ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ওসমান হাদির মতো সমসাময়িক যোদ্ধাদের নাম উল্লেখ করে তিনি এটিও বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, জামায়াত এখন শুধু অতীতের তর্কে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ধারণ করতে আগ্রহী।
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: রাত ৯:০০
...