ইরানে সংস্কারপন্থী রাজনীতিবিদসহ ৪ জন গ্রেপ্তার: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে নতুন উত্তেজনা

Sanatan Patra
Iran national flag amid protests

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে ‘রাজনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্টের চেষ্টা’ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন প্রভাবশালী সংস্কারপন্থী রাজনীতিবিদ রয়েছেন। এই ঘটনায় দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রোববার গ্রেপ্তার হওয়া তিন সংস্কারপন্থী রাজনীতিবিদ হলেন ইরানের রিফর্ম ফ্রন্টের প্রধান আজার মানসুরি, সাবেক কূটনীতিক মোহসেন আমিনজাদেহ এবং সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য ইব্রাহিম আসগারজাদেহ। চতুর্থ ব্যক্তির নাম কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি।

ইরানের বিচার বিভাগ বলছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির মুখে থাকাকালে এই গোষ্ঠীটি ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে সংগঠিতভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে এবং নেতৃত্ব দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মিজানের বরাতে জানানো হয়, দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বল করাই ছিল এই তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য।

ইরানের রিফর্ম ফ্রন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের গোয়েন্দা বাহিনী একটি বিচার বিভাগীয় আদেশের ভিত্তিতে আজার মানসুরিকে তাঁর বাড়ির দরজা থেকেই গ্রেপ্তার করে। একই সঙ্গে রিফর্ম ফ্রন্টের কো–চেয়ারম্যান মোহসেন আরমিন, সেক্রেটারি বদরাল সাদাত মোফিদিসহ আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে তলব করা হয়েছে।

এই গ্রেপ্তারের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন জানুয়ারি মাসে ইরানে সংঘটিত বিক্ষোভ ও দমন–পীড়ন নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের প্রতিবাদে গত মাসে তেহরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দ্রুত দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।

ইরানি কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই এসব বিক্ষোভকে কঠোরভাবে দমন করে এবং বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেয়। তেহরান এসব সহিংসতার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে দায়ী করে আসছে। ইরান সরকার জানায়, জানুয়ারির অস্থিরতায় মোট ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন এবং অধিকাংশের মৃত্যু ৮ ও ৯ জানুয়ারির রাতে ঘটে।

তবে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। তাদের দাবি, এসব হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় বাহিনী সরাসরি জড়িত ছিল। যদিও ইরান সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তারা ৬ হাজার ৮৫৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা যাচাই করেছে এবং আরও ১১ হাজার ২৮০টি ঘটনার তদন্ত চলছে।

বিক্ষোভ চলাকালে কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করেছে। এসব ঘটনার পর থেকে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের উত্তেজনা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে একাধিকবার নিন্দা জানিয়েছে।

তেহরান থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক তোহিদ আসাদি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর মতে, মোহসেন আমিনজাদেহ সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির শাসনামলে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এবং ইব্রাহিম আসগারজাদেহ একজন সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য, যিনি ১৯৭৯ সালে ছাত্রনেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখলের ঘটনায় যুক্ত ছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রেপ্তার হওয়া এসব রাজনীতিকের অতীতেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে বর্তমান অভিযোগ ও বিচারিক প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে তাঁদের আবারও দীর্ঘমেয়াদি কারাবরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইরানের এই পরিস্থিতি দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে নজর রাখা হচ্ছে।

...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top