নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দিতে বাংলাদেশের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক ভয়াবহ ও অস্বস্তিকর চিত্র উঠে এসেছে। শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচারবহির্ভূত সহিংসতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ দেওয়া জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি নতুন নয়; এটি স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যমান ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই খুনের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গুমের ভয়াবহ প্রবণতা, যা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর একটি নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও প্রাথমিক বাস্তবতা
জবানবন্দির শুরুতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া নিজের দায়িত্বকাল ও অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ে তিনি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীর ব্যবহার এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনীকে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোতায়েন করা হয়েছে। এসব অভিযানে কথিত অপরাধীদের আটক করে সেনা ক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এবং এর ফলে কিছু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যদিও শুরুতে এসব ঘটনার সংখ্যা সীমিত ছিল এবং তদন্ত ও শাস্তির মাধ্যমে বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অভ্যন্তরীণ অভিযান
পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিচালিত সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে সংঘর্ষ ও অভিযানের সময়ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে যেসব ঘটনা কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট যে, প্রাথমিক পর্যায়ে এসব মৃত্যু রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে নয়, বরং সংঘাতপূর্ণ বাস্তবতার ফল হিসেবে বিবেচিত হতো।
ডিহিউম্যানাইজেশন ও প্রশিক্ষণের প্রভাব
সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, একজন সেনাসদস্যকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে গিয়ে তাকে ধীরে ধীরে ডিহিউম্যানাইজ করা হয়। প্রশিক্ষণে ‘এক গুলি, এক শত্রু’ নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়, যেখানে মানুষের বদলে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ভাবতে শেখানো হয়। এই মানসিক প্রস্তুতি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হলেও বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে তা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এই কারণেই সেনাবাহিনীকে বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মিশিয়ে কাজ করানো তার মতে কখনোই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু ২০০৩ সালে র্যাব গঠনের মাধ্যমে সেই সীমারেখা ভেঙে দেওয়া হয়, যা তিনি “ভয়াবহ ও মারাত্মক সিদ্ধান্ত” হিসেবে উল্লেখ করেন।
র্যাব, অপারেশন ক্লিনহার্ট ও ইনডেমনিটি
র্যাব গঠনের আগের সময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাকালে বহু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সরকারি সূত্রে যেখানে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর সংখ্যা সীমিত বলা হয়েছিল, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে সেই সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। পরবর্তীতে এসব অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের ইনডেমনিটি দেওয়াকে তিনি কার্যত হত্যার লাইসেন্স হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
এই সংস্কৃতিই পরবর্তী সময়ে র্যাবের ভেতরে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে বলে তিনি মত দেন। তার মতে, সেনাসদস্যদের যে প্রশিক্ষণ যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে প্রয়োগ করলে ফল হয় ভয়াবহ।
জরুরি অবস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থার আধিপত্য
২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের জরুরি অবস্থার সময়কে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই সময়ে ডিজিএফআই দেশের প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়। রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে তুলে এনে সেলে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। এই অভ্যাসই ভবিষ্যতে গুম সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি করে বলে তিনি মনে করেন।
জরুরি অবস্থার সময় সেনাসদস্যদের মধ্যে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন, নগদ সংস্কৃতির উত্থান এবং অন্ধ আনুগত্যের প্রবণতা তৈরি হয়, যা সামরিক শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বকে দুর্বল করে দেয়।
বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও তার প্রভাব
২০০৯ সালে বিডিআর হত্যাকাণ্ডকে তিনি বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত হিসেবে উল্লেখ করেন। এই ঘটনায় বিপুল সংখ্যক সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। বিদ্রোহ দমনের পর জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনের কারণে আরও বহু বিডিআর সদস্যের মৃত্যু হয় বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য তিনি উল্লেখ করেন।
এরপর দেওয়া ব্যাপক মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সেনাবাহিনীর ভেতরে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভারত ও আওয়ামী লীগবিরোধী মনোভাব, সিনিয়র–জুনিয়র বিভাজন এবং অনুগত অফিসারদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে থাকে।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার বলয়
জবানবন্দির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশে তিনি বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করতে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে একাধিক চক্রে বিভক্ত করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এসব চক্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, গুম ও খুনের মতো কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব চক্র রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে এমনভাবে প্রোথিত হয় যে, বাহিনী প্রধানদের সিদ্ধান্তও অনেক সময় কার্যকর থাকত না।
র্যাব নিয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা
সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর র্যাবের বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড বন্ধের চেষ্টা করেছিলেন বলে ইকবাল করিম ভূঁইয়া জানান। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডেকে সতর্ক করেন এবং প্রতিশ্রুতি পেলেও বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। বরং ঘটনা আড়াল করার প্রবণতা বেড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল পেশাদার সেনা অফিসাররা র্যাবে গিয়ে পেশাদার খুনিতে পরিণত হয়ে ফিরে আসছিলেন। এই বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
নৈতিক অবস্থান ও প্রতিরোধের চেষ্টা
র্যাবে যাওয়ার আগে ও পরে অফিসারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি তাদের নৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতেন। নরহত্যাকে মহাপাপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি তাদের বিবেক জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। এমনকি কেউ কিলিং মিশনের আদেশ পেলে সরাসরি তাকে ফোন করার আহ্বান জানান।
তার এই উদ্যোগে অন্তত কিছু অফিসার হত্যামিশন প্রত্যাখ্যান করে সেনানিবাসে ফিরে আসেন, যা তিনি নিজের দায়িত্বকালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখেন।
উপসংহার
ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি কেবল একটি মামলার সাক্ষ্য নয়; এটি বাংলাদেশের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কয়েক দশকের জটিল ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত দলিল। এতে উঠে এসেছে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিচারবহির্ভূত সহিংসতা এবং পেশাদারিত্বের ক্ষয়ের বাস্তব চিত্র। এই জবানবন্দি বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় সংস্কারের আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: প্রথম আলো