সনাতন পত্র ডেস্ক
আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রতিবেদন
ভারতে ছাত্রী ও কর্মজীবী নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক ঋতুকালীন ছুটি চালুর দাবি নিয়ে দায়ের করা একটি আবেদন খারিজ করে দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, এই ধরনের ছুটি আইন করে বাধ্যতামূলক করা হলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিচারপতিরা মনে করেন, আইনগতভাবে এমন বিধান চালু করা হলে অনেক নিয়োগকর্তা নারীদের কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।
শুক্রবার এই আবেদনের শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আবেদনের পক্ষে উত্থাপিত যুক্তি শুনে বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে তা এমনভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন যাতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি বৈষম্য তৈরি না হয়। আদালত মনে করে, বাধ্যতামূলক ঋতুকালীন ছুটির আইন কর্মক্ষেত্রে উল্টো নারীদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কর্মক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। তবে একটি বিষয়কে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হলে অনেক সময় তার ভিন্নধর্মী প্রভাব দেখা যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যদি আইন করে ঋতুকালীন ছুটি নিশ্চিত করা হয়, তবে নিয়োগকর্তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে নারী কর্মীদের নিয়োগ দিলে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও কার্যগত চাপ সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের আইন চালু হলে নারীদের সম্পর্কে ভুল ধারণা বা পূর্বধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে। অনেক নিয়োগকর্তা তখন মনে করতে পারেন যে নারীরা নিয়মিতভাবে কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত থাকতে পারবেন না অথবা তাঁদের কর্মক্ষমতা পুরুষদের তুলনায় কম। আদালতের মতে, এই ধরনের ধারণা তৈরি হওয়া নারীদের পেশাগত অগ্রগতির পথে নতুন বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রধান বিচারপতি আবেদনকারীকে উদ্দেশ করে বলেন, নিয়োগকর্তাদের মানসিকতা সম্পর্কে বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। তিনি সতর্ক করে দেন যে বাধ্যতামূলক ছুটির বিধান চালু হলে অনেক প্রতিষ্ঠান নারী কর্মী নিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারে। ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বদলে তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বেঞ্চের অপর বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও বিষয়টি নিয়ে মতামত দেন। তিনি বলেন, সংবিধানে নারীদের প্রতি ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং তা সমাজে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্রও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তার মতে, যদি কোনো মানবসম্পদকে বাজারের দৃষ্টিতে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় মনে হয়, তাহলে সেই মানবসম্পদের গ্রহণযোগ্যতাও কমে যেতে পারে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে নিজেদের কার্যকারিতা বজায় রাখতে চায়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নিয়োগকর্তারা এমন নীতির প্রতি অনীহা দেখাতে পারেন যা তাদের দৃষ্টিতে অতিরিক্ত দায় বা বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
বিচারপতি বাগচী বলেন, কর্মসংস্থানের বাস্তবতা বোঝা জরুরি। যদি আইন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয় যাতে নিয়োগকর্তারা মনে করেন নারী কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া তুলনামূলক জটিল বা ব্যয়বহুল, তাহলে তারা বিকল্প হিসেবে পুরুষ কর্মীদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এই পরিস্থিতি নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করে দিতে পারে।
ঋতুকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠি। তাঁর আবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছাত্রী এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি চেয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট যেন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা দেয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে ঋতুকালীন ছুটির ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
আবেদনকারী যুক্তি দেন, অনেক নারী মাসিকের সময় শারীরিক অসুস্থতা বা অস্বস্তির কারণে কাজ বা পড়াশোনায় পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেন না। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের ছুটি নিশ্চিত করা উচিত। তবে আদালত এই আবেদনকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করে এবং সেই প্রেক্ষিতে আবেদনটি গ্রহণ করেনি।
প্রধান বিচারপতি এই আবেদনকে ‘ভীতি সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, যদি এমন আইন প্রণয়ন করা হয়, তাহলে সমাজের কিছু অংশে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে মাসিক বা ঋতুস্রাব নারীদের দুর্বল করে দেয় এবং তারা কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় কম সক্ষম। আদালত মনে করে, এই ধরনের ধারণা নারীদের মর্যাদা ও সক্ষমতা সম্পর্কে ভুল বার্তা দিতে পারে।
শুনানির সময় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আর শামশাদ আদালতের সামনে কেরালার একটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৩ সালে কেরালা সরকার রাজ্যের সব রাষ্ট্রায়ত্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য ঋতুকালীন ছুটির ব্যবস্থা চালু করেছিল। সেই সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এই সিদ্ধান্তকে লিঙ্গসমতা ভিত্তিক সমাজ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
শামশাদ আরও জানান, বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট সংস্থা স্বেচ্ছাসেবীভাবে নারী কর্মীদের জন্য ঋতুকালীন ছুটির সুযোগ প্রদান করছে। এসব উদ্যোগ বাধ্যতামূলক নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালার অংশ হিসেবে চালু হয়েছে।
তবে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ স্বেচ্ছাসেবী বা ঐচ্ছিক হওয়ায় তা কার্যকর হতে পেরেছে। কিন্তু যখনই এটিকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হবে, তখন নিয়োগকর্তাদের আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান তখন নারী কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে এবং তাদের কর্মজীবনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছিল। সেই রায়ে আদালত মাসিককালীন স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতাকে মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আদালত বলেছিল, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত ‘জীবনের অধিকার’ এবং ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার’-এর সঙ্গে মাসিককালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরাসরি সম্পর্কিত।
সে সময় বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ বলেছিলেন, নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আদালত নির্দেশ দিয়েছিল যে রাজ্য সরকারগুলোকে মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনস্থানে পৃথক টয়লেট নির্মাণ এবং মাসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের স্বাস্থ্য ও কর্মজীবনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য শিক্ষা, সচেতনতা এবং কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আইনগত বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা এবং সহানুভূতিশীল নীতি অনেক সময় বেশি কার্যকর হতে পারে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্ত কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিকার, স্বাস্থ্য এবং সমতার প্রশ্নে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। আদালত স্পষ্ট করেছে যে নারীদের প্রতি সংবেদনশীলতা ও সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তবে সেই ব্যবস্থা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত না হয়ে পড়ে।
শুক্রবার এই আবেদনের শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আবেদনের পক্ষে উত্থাপিত যুক্তি শুনে বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে তা এমনভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন যাতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি বৈষম্য তৈরি না হয়। আদালত মনে করে, বাধ্যতামূলক ঋতুকালীন ছুটির আইন কর্মক্ষেত্রে উল্টো নারীদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কর্মক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। তবে একটি বিষয়কে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হলে অনেক সময় তার ভিন্নধর্মী প্রভাব দেখা যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যদি আইন করে ঋতুকালীন ছুটি নিশ্চিত করা হয়, তবে নিয়োগকর্তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে নারী কর্মীদের নিয়োগ দিলে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও কার্যগত চাপ সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের আইন চালু হলে নারীদের সম্পর্কে ভুল ধারণা বা পূর্বধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে। অনেক নিয়োগকর্তা তখন মনে করতে পারেন যে নারীরা নিয়মিতভাবে কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত থাকতে পারবেন না অথবা তাঁদের কর্মক্ষমতা পুরুষদের তুলনায় কম। আদালতের মতে, এই ধরনের ধারণা তৈরি হওয়া নারীদের পেশাগত অগ্রগতির পথে নতুন বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রধান বিচারপতি আবেদনকারীকে উদ্দেশ করে বলেন, নিয়োগকর্তাদের মানসিকতা সম্পর্কে বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। তিনি সতর্ক করে দেন যে বাধ্যতামূলক ছুটির বিধান চালু হলে অনেক প্রতিষ্ঠান নারী কর্মী নিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারে। ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বদলে তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বেঞ্চের অপর বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও বিষয়টি নিয়ে মতামত দেন। তিনি বলেন, সংবিধানে নারীদের প্রতি ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং তা সমাজে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্রও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তার মতে, যদি কোনো মানবসম্পদকে বাজারের দৃষ্টিতে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় মনে হয়, তাহলে সেই মানবসম্পদের গ্রহণযোগ্যতাও কমে যেতে পারে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে নিজেদের কার্যকারিতা বজায় রাখতে চায়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নিয়োগকর্তারা এমন নীতির প্রতি অনীহা দেখাতে পারেন যা তাদের দৃষ্টিতে অতিরিক্ত দায় বা বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
বিচারপতি বাগচী বলেন, কর্মসংস্থানের বাস্তবতা বোঝা জরুরি। যদি আইন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয় যাতে নিয়োগকর্তারা মনে করেন নারী কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া তুলনামূলক জটিল বা ব্যয়বহুল, তাহলে তারা বিকল্প হিসেবে পুরুষ কর্মীদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এই পরিস্থিতি নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করে দিতে পারে।
ঋতুকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠি। তাঁর আবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছাত্রী এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি চেয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট যেন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা দেয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে ঋতুকালীন ছুটির ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
আবেদনকারী যুক্তি দেন, অনেক নারী মাসিকের সময় শারীরিক অসুস্থতা বা অস্বস্তির কারণে কাজ বা পড়াশোনায় পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেন না। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের ছুটি নিশ্চিত করা উচিত। তবে আদালত এই আবেদনকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করে এবং সেই প্রেক্ষিতে আবেদনটি গ্রহণ করেনি।
প্রধান বিচারপতি এই আবেদনকে ‘ভীতি সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, যদি এমন আইন প্রণয়ন করা হয়, তাহলে সমাজের কিছু অংশে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে মাসিক বা ঋতুস্রাব নারীদের দুর্বল করে দেয় এবং তারা কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় কম সক্ষম। আদালত মনে করে, এই ধরনের ধারণা নারীদের মর্যাদা ও সক্ষমতা সম্পর্কে ভুল বার্তা দিতে পারে।
শুনানির সময় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আর শামশাদ আদালতের সামনে কেরালার একটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৩ সালে কেরালা সরকার রাজ্যের সব রাষ্ট্রায়ত্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য ঋতুকালীন ছুটির ব্যবস্থা চালু করেছিল। সেই সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এই সিদ্ধান্তকে লিঙ্গসমতা ভিত্তিক সমাজ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
শামশাদ আরও জানান, বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট সংস্থা স্বেচ্ছাসেবীভাবে নারী কর্মীদের জন্য ঋতুকালীন ছুটির সুযোগ প্রদান করছে। এসব উদ্যোগ বাধ্যতামূলক নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালার অংশ হিসেবে চালু হয়েছে।
তবে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ স্বেচ্ছাসেবী বা ঐচ্ছিক হওয়ায় তা কার্যকর হতে পেরেছে। কিন্তু যখনই এটিকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হবে, তখন নিয়োগকর্তাদের আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান তখন নারী কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে এবং তাদের কর্মজীবনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছিল। সেই রায়ে আদালত মাসিককালীন স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতাকে মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আদালত বলেছিল, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত ‘জীবনের অধিকার’ এবং ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার’-এর সঙ্গে মাসিককালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরাসরি সম্পর্কিত।
সে সময় বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ বলেছিলেন, নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আদালত নির্দেশ দিয়েছিল যে রাজ্য সরকারগুলোকে মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনস্থানে পৃথক টয়লেট নির্মাণ এবং মাসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের স্বাস্থ্য ও কর্মজীবনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য শিক্ষা, সচেতনতা এবং কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আইনগত বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা এবং সহানুভূতিশীল নীতি অনেক সময় বেশি কার্যকর হতে পারে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্ত কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিকার, স্বাস্থ্য এবং সমতার প্রশ্নে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। আদালত স্পষ্ট করেছে যে নারীদের প্রতি সংবেদনশীলতা ও সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তবে সেই ব্যবস্থা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত না হয়ে পড়ে।
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: এখন সময়
...