নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৩৮
“ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে,
বসন্তের রাতে/ বিছানায় শুয়ে আছি;
এখন সে কত রাত!
ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,
স্কাইলাইট মাথার উপর,
আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।
তারপর চ’লে যায় কোথায় আকাশে?
তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে!”
‘পাখিরা’ কবিতায় বসন্তরাত্রির আবহ এভাবেই নির্মাণ করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ।
রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কাব্যের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জন্মশহর বরিশালে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে নগরের জীবনানন্দ দাশ সড়কে কবির পৈতৃক ভিটায় স্থাপিত স্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগারে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।
সকাল ৯টার দিকে প্রগতি লেখক সংঘসহ বরিশালের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা কবির ম্যুরালে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশনের আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের ভাষ্য, নতুন প্রজন্মের কাছে কবির সাহিত্যচিন্তা ও জীবনদর্শন তুলে ধরাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি যেমন গভীরভাবে উপস্থিত, তেমনি রয়েছে সময়চেতনা, ইতিহাসবোধ ও ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বসংকট। নির্জনতার কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি কেবল ব্যক্তিগত বেদনা নয়, সভ্যতার টানাপোড়েনও শিল্পিতভাবে তুলে ধরেছেন। উপমা, চিত্রকল্প ও শব্দনিরীক্ষায় তাঁর স্বকীয়তা বাংলা আধুনিক কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি তপংকর চক্রবর্তী বলেন, জীবনানন্দ দাশ ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত সরকারি ব্রজমোহন কলেজের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। কলেজ প্রাঙ্গণে তাঁর নামে একটি ছাত্রাবাস থাকলেও গবেষণা ও পদ্ধতিগত পাঠচর্চার জন্য আলাদা কোনো স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঠক ও গবেষকেরা বরিশালে এসে কবির স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে পর্যাপ্ত তথ্য বা আয়োজন না পেয়ে হতাশ হন।
তপংকর চক্রবর্তীর বক্তব্যে উঠে আসে, জীবনানন্দ দাশ শুধু বাংলা ভাষার কবি নন; তিনি বিশ্বসাহিত্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। গবেষক ক্লিনটন বি সিলি তাঁর জীবন ও কবিতা নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে ইংরেজিভাষী পাঠকের কাছে জীবনানন্দকে পরিচিত করে তুলেছেন। বক্তাদের মতে, কবিকে স্মরণ করার অর্থ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাকে শক্তিশালী করা।
আলোচনা সভায় টুনুরানী কর্মকার, কবি অপূর্ব গৌতম, আবুল কালাম আজাদ, শোভন কর্মকার ও সুভাষ চন্দ্র দাস বক্তব্য দেন। তাঁরা বলেন, জীবনানন্দের কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম প্রকৃতি ও মানবজীবনের গভীর সম্পর্ক বুঝতে পারে। তাঁর কাব্যে গ্রামবাংলার দৃশ্য, নদী, ধানক্ষেত, কুয়াশা ও নিসর্গ কেবল পটভূমি নয়, বরং ভাবনার অন্তর্গত উপাদান।
সকাল ১০টায় সরকারি ব্রজমোহন কলেজ প্রাঙ্গণে কবি জীবনানন্দ দাশ চত্বরে পৃথক কর্মসূচি পালন করে উত্তরণ সাংস্কৃতিক সংগঠন। কলেজের উপাধ্যক্ষ আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলামের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাবেক অধ্যক্ষ স ম ইমানুল হাকিম, অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক সংগীতা সরকার ও সহকারী অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম বক্তব্য দেন। তাঁরা বলেন, কলেজের সঙ্গে কবির স্মৃতির সম্পর্ক শিক্ষার্থীদের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
জীবনানন্দ দাশের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে। তিনি ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও ব্রজমোহন কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে একই কলেজের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেন। বরিশাল শহরেই তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের একটি বড় অংশ কেটেছে।
তাঁর বহু কবিতা ও রচনায় বরিশালের প্রকৃতি, নদী ও জনপদের প্রতিফলন দেখা যায়।
সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, জীবনানন্দ দাশের কাব্যজগৎ আধুনিকতার এক ভিন্ন রূপ তুলে ধরে। তাঁর ভাষা কখনো সরল, কখনো গাঢ় ও প্রতীকী। সময়ের বিচ্ছিন্নতা, মানুষের একাকিত্ব ও ইতিহাসের অভিঘাত তাঁর কবিতায় অনুরণিত হয়েছে। ‘রূপসী বাংলা’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’সহ বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী গুরুত্ব অর্জন করেছে।
বরিশালে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ শিক্ষার্থী বলেন, পাঠ্যবইয়ের বাইরে জীবনানন্দকে নতুনভাবে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে এই আয়োজনের মাধ্যমে। আবৃত্তি ও আলোচনার মধ্য দিয়ে কবির ভাবনা ও কাব্যভাষা তাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আয়োজকেরা জানিয়েছেন, জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বছরজুড়ে বিভিন্ন পাঠচক্র, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁদের মতে, কবিকে স্মরণ মানে তাঁর সাহিত্যকে নিয়মিত পাঠ ও বিশ্লেষণের মধ্যে রাখা।
দিনব্যাপী শ্রদ্ধা ও স্মরণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বরিশাল আবারও স্মরণ করেছে সেই কবিকে, যাঁর লেখায় এই জনপদের প্রকৃতি ও মানবজীবন নতুন অর্থে ধরা পড়েছে। জন্মের ১২৭ বছর পরও জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতায় এক অমোচনীয় উপস্থিতি হয়ে আছেন।
...