অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের বিশ্লেষণ:
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি করেছে। এত তাড়াহুড়া করে বাণিজ্য চুক্তি করার রহস্য আমার কাছে পরিষ্কার নয়। এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে। কিছুদিন কেন অপেক্ষা করা গেল না? নির্বাচিত সরকার পর্যালোচনা করে চুক্তিটি করতে পারত। কেননা, চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে তাদের।
চুক্তির মধ্যে দুই দেশের দেনা-পাওনার ব্যাপার রয়েছে, যার প্রভাব রয়েছে অর্থনীতিতে। সুতরাং নতুন সরকারের জন্যই বিষয়টি রেখে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে এই কারণে বলছি, চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথম ধাপেই প্রায় দেড় হাজার পণ্যে আমদানিতে শুল্কছাড় দিতে হবে। শুল্কের এই নমনীয়তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধি ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নয়। এ কারণে এসব পণ্য আমদানিতে একই সুবিধা অন্যান্য দেশকেও দিতে হবে, যা আমাদের বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের অভিঘাতের কারণ হবে।
আবার বলা হয়েছে, বছরে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে। এই আমদানির সামান্য অংশই করবে সরকার। বড় অংশই আমদানি করবেন ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তারা। তারা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক না হলে কেন আমদানি করবেন? কারণ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে লিড টাইমের বিষয় রয়েছে। পরিবহন খরচের বিষয় আছে। এত কিছুর পরও যদি আমদানি করতে হয়, সে ক্ষেত্রে ভর্তুকি সুবিধা চাইবেন আমদানিকারকরা, যা রাজস্বের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। আবার স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) সারি থেকে উত্তরণের পর প্রত্যক্ষ ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। ডব্লিউটিওর সেই বিধিনিষেধও রয়েছে।
আমি অন্তত একটা সুবিধা এ পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। এটি হচ্ছে, মার্কিন তুলায় উৎপাদিত পণ্যে পাল্টা শুল্কছাড় সুবিধা। আমাদের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকের ৭৪ শতাংশ তুলানির্ভর। সে কারণে তুলার একটা বিশাল চাহিদা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য উৎপাদিত পোশাক যদি দেশটি থেকে আমদানি করা তুলনায় তৈরি করা সম্ভব হয়, সে ক্ষেত্রে পাল্টা শুল্ক অংশে ছাড় পাওয়া যাবে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান রপ্তানি বাজার। সে হিসেবে এটা একটা বড় সুবিধাই বটে।
পাল্টা শুল্কছাড় মিললেও পণ্যভিত্তিক শুল্কে কিন্তু ছাড় মিলবে না। বুঝতে হবে, পারস্পরিক বা পাল্টা শুল্ক হলো পণ্যভিত্তিক শুল্কের অতিরিক্ত শুল্ক। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যে ধরনের পোশাক রপ্তানি করে থাকে, সেগুলোর গড় শুল্ক ১৬ শতাংশ। সেই ১৬ শতাংশ কিন্তু রয়েছে। এর সঙ্গে ১৯ শতাংশ যোগ হবে। বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকম। যেমন– ভারতের ১৮ শতাংশ।
আমার মতে, মার্কিন তুলা আমদানির কারণে সুবিধাটি নিতে লিড টাইমের বিষয়টি কেমন করে সহনীয় এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করা যায়, সেটি ভাবতে হবে। সরকার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) নির্মাণের কথা বলেছে। মার্কিন তুলার মজুত, সংরক্ষণসহ যে কোনো দেশের পণ্য বা কাঁচামাল এখানে সংরক্ষণ এবং রপ্তানি করা যাবে।
লেখক সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি
...