ফাঁস হওয়া নথিতে ৬৪ ডিসির রাজনৈতিক পরিচয়: ‘নিরপেক্ষ’ প্রশাসন নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

Sanatan Patra
ফাঁস হওয়া নথিতে জেলা প্রশাসকদের রাজনৈতিক পরিচয়

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এমন এক সময়ে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে যখন গভীর প্রশ্ন ও সংশয়, ঠিক তখনই ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের রাজনৈতিক পরিচয়সংবলিত একটি গোপন নথি ফাঁস হওয়ার অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। ফাঁস হওয়া ওই নথিতে প্রশাসনের শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তাদের নামের পাশে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় যুক্ত থাকার বিষয়টি সামনে আসায় নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।

নথিতে দেখা যাচ্ছে, ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের নাম, বিসিএস ব্যাচ এবং তাঁদের কথিত রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ‘বিএনপি’, ‘জামায়াত’ ও ‘এনসিপি (NCP)’—এই তিনটি রাজনৈতিক ট্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বা প্রশাসনিক যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁদের মূল্যায়ন ও শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে।

নথির সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ৬৪ জেলার মধ্যে ৫২ জেলাতেই জামায়াত ও এনসিপি মতাদর্শের কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক হিসেবে চিহ্নিত। বিপরীতে বিএনপিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মাত্র ১২ জন কর্মকর্তাকে। এই পরিসংখ্যান থেকেই প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি সুস্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নথিতে আরও দেখা যায়, অনেক কর্মকর্তার নামের পাশে তাঁদের বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি অতীত রাজনৈতিক অবস্থানের উল্লেখও রয়েছে। কোথাও লেখা হয়েছে ‘পূর্বে বিএনপি’, কোথাও ‘পূর্বে জামায়াত’ বা ‘পূর্বে সুশীল’। ফলে প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থাকা কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস কেন এভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং কার স্বার্থে এই তথ্যভান্ডার তৈরি করা হলো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা প্রশাসকরা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বই পালন করেন না, নির্বাচনকালে তাঁরা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বেও থাকেন। নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্র স্থাপন, প্রার্থীদের মনোনয়ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়—সব ক্ষেত্রেই ডিসিদের সিদ্ধান্ত ও অবস্থান সরাসরি নির্বাচনের স্বচ্ছতার সঙ্গে যুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে এমন রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের অভিযোগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের মতে, কোনো কর্মকর্তার নামের পাশে দলীয় পরিচয় যুক্ত থাকলে তাঁর নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়।

প্রশাসনের এমন দলীয়করণের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নন। তাঁদের ভাষায়, যখন একজন ডিসির নামের পাশে ব্র্যাকেটে কোনো দলের নাম লেখা হয়, তখন ধরে নিতে হবে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।

ওই সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা আরও বলেন, নির্বাচনের আগে এ ধরনের তালিকা তৈরি বা ফাঁস হওয়া প্রমাণ করে যে মাঠ প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার একটি নীলনকশা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাঁর মতে, এটি শুধু প্রশাসনের জন্য নয়, গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও অশনিসংকেত।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের অভিমতও প্রায় একই। তাঁরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তারা অবচেতনভাবেই দলীয় আনুগত্যের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেন না। এর ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাত তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত সুশাসনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই নথির তথ্য সত্য হয়, তবে তা নির্বাচন কমিশন ও সরকারের জন্য বড় ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি করবে। কারণ, নির্বাচনের মাঠে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নথি ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা আরও তীব্র হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এমন রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে আদৌ কি নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব, নাকি প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ধারণাটিই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সব মিলিয়ে, ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের রাজনৈতিক পরিচয়সংবলিত নথি ফাঁসের অভিযোগ শুধু একটি তথ্যফাঁসের ঘটনা নয়; এটি দেশের প্রশাসনিক কাঠামো, গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top