সনাতন পত্র ডেস্ক
সংবাদের বিষয় প্রতিবেদন
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অসংখ্য নারী-পুরুষের ত্যাগ, সাহস ও আত্মোৎসর্গের কাহিনি ছড়িয়ে রয়েছে। সেই ইতিহাসে অনেক নাম আলোচনায় এলেও আবার অনেক বীরযোদ্ধার গল্প রয়ে গেছে তুলনামূলকভাবে অজানা। তেমনই এক সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা আশালতা বৈদ্য, যিনি অল্প বয়সেই অস্ত্র হাতে দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং নারী গেরিলা বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে।
১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, তখন আশালতা বৈদ্য ছিলেন একজন স্কুলছাত্রী। সে সময় তিনি এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকারদের অত্যাচারে দেশের সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার তখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে।
গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় আশালতার পরিবারও সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। একদিন স্থানীয় রাজাকাররা আশালতার বাবা হরিপদ বৈদ্যের কাছে একটি হুমকিমূলক বার্তা পৌঁছে দেয়। সেখানে বলা হয়েছিল, তার দুই মেয়েকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে অথবা বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হবে। এই হুমকির কারণে পুরো পরিবার চরম উদ্বেগে পড়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরিপদ বৈদ্য এবং তাঁর স্ত্রী সরলাময়ী সিদ্ধান্ত নেন যে তারা ভারতে চলে যাবেন।
পরিবারের সদস্যরা সীমান্ত পার হওয়ার প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেন। এমনকি দিন-তারিখও ঠিক হয়ে যায়। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী মঙ্গলবার তারা দেশ ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনার ঠিক আগের দিন রাতে ঘটে যায় এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা আশালতা বৈদ্যের জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
সেই রাতে হঠাৎ করে তাদের বাড়িতে উপস্থিত হন হেমায়েত উদ্দিন, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় কোটালীপাড়া অঞ্চলে সক্রিয় হেমায়েত বাহিনীর একজন সাহসী নেতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি হরিপদ বৈদ্যকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে প্রত্যেক পরিবারকে স্বাধীনতার লড়াইয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি অনুরোধ জানান যে পরিবার থেকে একজন সদস্যকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য দিতে হবে।
হেমায়েত উদ্দিনের এই আহ্বান শুনে ঘরের ভেতর থেকে আশালতা সাহসিকতার সঙ্গে নিজের মত প্রকাশ করেন। তিনি বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যেতে চান। তার এই দৃঢ় সিদ্ধান্তে উপস্থিত সবাই বিস্মিত হলেও হেমায়েত উদ্দিন অত্যন্ত আনন্দিত হন। তিনি বুঝতে পারেন যে এই তরুণীর মধ্যে রয়েছে অসাধারণ সাহস এবং দেশপ্রেম।
হরিপদ বৈদ্য প্রথমে কিছুটা উদ্বিগ্ন হলেও মেয়ের দৃঢ় ইচ্ছার সামনে শেষ পর্যন্ত আপত্তি জানাননি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যদি তার মেয়ে নিজের ইচ্ছায় দেশের জন্য যুদ্ধ করতে চায়, তবে তিনি তাকে বাধা দেবেন না। বরং দেশের স্বার্থে তিনি নিজের সন্তানকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। এই সিদ্ধান্তই আশালতার মুক্তিযোদ্ধা জীবনের সূচনা ঘটায়।
পরদিন সকালে আশালতাকে নির্দেশ দেওয়া হয় আশপাশের এলাকা থেকে মেয়েদের সংগঠিত করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসতে। আশালতা দায়িত্বটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেন। তিনি তার দুই বোন, ভাই হরগোবিন্দসহ সহপাঠী ও প্রতিবেশী মিলিয়ে মোট ৪৫ জন তরুণীকে সংগঠিত করেন এবং সবাইকে নিয়ে লাটেঙ্গা লেবুবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন।
পরবর্তীতে তাকে প্রায় ৩৫০ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ বাহিনীর অন্যতম সক্রিয় অংশ ছিল ৪৫ সদস্যের একটি সশস্ত্র নারী গেরিলা দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন আশালতা বৈদ্য। এই দলটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয় বরিশালের হেরেকান্দি হাইস্কুল এবং লেবুবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে অস্ত্র পরিচালনা, কৌশলগত যুদ্ধ পরিচালনা এবং গেরিলা কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আশালতা অল্প সময়ের মধ্যেই অস্ত্র ব্যবহারে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন এবং প্রশিক্ষণে সবার মধ্যে সেরা হিসেবে বিবেচিত হন।
এক পর্যায়ে হেমায়েত উদ্দিনের নির্দেশে আশালতার নেতৃত্বে ২৪ জন নারী সদস্যকে নিয়ে একটি বিশেষ কমান্ডো দল গঠন করা হয়। এই দলের প্রধান দায়িত্ব ছিল শত্রুপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা, ছদ্মবেশে গেরিলা আক্রমণ চালানো এবং প্রয়োজন হলে আত্মঘাতী মিশনেও অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা। দলের সদস্যরা সবসময় দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন।
রামশীল নদীর তীরে একবার পাকিস্তানি বাহিনী এবং রাজাকারদের একটি দল লঞ্চে করে এলাকায় প্রবেশ করে। সেই সময় আশালতা ও তার সহযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষ চলে এবং প্রায় তিন ঘণ্টারও বেশি সময় যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারাই বিজয় অর্জন করেন এবং শত্রুপক্ষকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আশালতা বৈদ্য শুধু ছোটখাটো গেরিলা অভিযানেই অংশ নেননি, বরং গোপালগঞ্জ অঞ্চলে সংঘটিত প্রায় ২২টি বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রূষার কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি মানবিক দায়িত্ব পালনেও ছিলেন সমান সক্রিয়।
স্বাধীনতার পর তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেন।
১৯৮০-এর দশকে নারীদের উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “সূর্যমুখী সংস্থা” নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তিনি এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোনো খেতাব বা উপাধি পাননি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আশালতা বৈদ্যের মতো অনেক সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধার অবদান আজও যথেষ্ট আলোচিত নয়। অথচ তাদের ত্যাগ, সাহস ও আত্মনিবেদন দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব অজানা কাহিনি তুলে ধরা ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
কার্টেসি: গিরিধর দে/ বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র।
১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, তখন আশালতা বৈদ্য ছিলেন একজন স্কুলছাত্রী। সে সময় তিনি এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকারদের অত্যাচারে দেশের সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার তখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে।
গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় আশালতার পরিবারও সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। একদিন স্থানীয় রাজাকাররা আশালতার বাবা হরিপদ বৈদ্যের কাছে একটি হুমকিমূলক বার্তা পৌঁছে দেয়। সেখানে বলা হয়েছিল, তার দুই মেয়েকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে অথবা বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হবে। এই হুমকির কারণে পুরো পরিবার চরম উদ্বেগে পড়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরিপদ বৈদ্য এবং তাঁর স্ত্রী সরলাময়ী সিদ্ধান্ত নেন যে তারা ভারতে চলে যাবেন।
পরিবারের সদস্যরা সীমান্ত পার হওয়ার প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেন। এমনকি দিন-তারিখও ঠিক হয়ে যায়। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী মঙ্গলবার তারা দেশ ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনার ঠিক আগের দিন রাতে ঘটে যায় এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা আশালতা বৈদ্যের জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
সেই রাতে হঠাৎ করে তাদের বাড়িতে উপস্থিত হন হেমায়েত উদ্দিন, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় কোটালীপাড়া অঞ্চলে সক্রিয় হেমায়েত বাহিনীর একজন সাহসী নেতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি হরিপদ বৈদ্যকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে প্রত্যেক পরিবারকে স্বাধীনতার লড়াইয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি অনুরোধ জানান যে পরিবার থেকে একজন সদস্যকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য দিতে হবে।
হেমায়েত উদ্দিনের এই আহ্বান শুনে ঘরের ভেতর থেকে আশালতা সাহসিকতার সঙ্গে নিজের মত প্রকাশ করেন। তিনি বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যেতে চান। তার এই দৃঢ় সিদ্ধান্তে উপস্থিত সবাই বিস্মিত হলেও হেমায়েত উদ্দিন অত্যন্ত আনন্দিত হন। তিনি বুঝতে পারেন যে এই তরুণীর মধ্যে রয়েছে অসাধারণ সাহস এবং দেশপ্রেম।
হরিপদ বৈদ্য প্রথমে কিছুটা উদ্বিগ্ন হলেও মেয়ের দৃঢ় ইচ্ছার সামনে শেষ পর্যন্ত আপত্তি জানাননি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যদি তার মেয়ে নিজের ইচ্ছায় দেশের জন্য যুদ্ধ করতে চায়, তবে তিনি তাকে বাধা দেবেন না। বরং দেশের স্বার্থে তিনি নিজের সন্তানকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। এই সিদ্ধান্তই আশালতার মুক্তিযোদ্ধা জীবনের সূচনা ঘটায়।
পরদিন সকালে আশালতাকে নির্দেশ দেওয়া হয় আশপাশের এলাকা থেকে মেয়েদের সংগঠিত করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসতে। আশালতা দায়িত্বটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেন। তিনি তার দুই বোন, ভাই হরগোবিন্দসহ সহপাঠী ও প্রতিবেশী মিলিয়ে মোট ৪৫ জন তরুণীকে সংগঠিত করেন এবং সবাইকে নিয়ে লাটেঙ্গা লেবুবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন।
নারী মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর নেতৃত্ব
আশালতা বৈদ্যের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে কোটালীপাড়া সীমানা সাব-সেক্টরে হেমায়েত বাহিনীর নারী ইউনিটে যোগ দেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার নেতৃত্বগুণ এবং সাহসিকতা সবার নজরে আসে।পরবর্তীতে তাকে প্রায় ৩৫০ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ বাহিনীর অন্যতম সক্রিয় অংশ ছিল ৪৫ সদস্যের একটি সশস্ত্র নারী গেরিলা দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন আশালতা বৈদ্য। এই দলটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয় বরিশালের হেরেকান্দি হাইস্কুল এবং লেবুবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে অস্ত্র পরিচালনা, কৌশলগত যুদ্ধ পরিচালনা এবং গেরিলা কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আশালতা অল্প সময়ের মধ্যেই অস্ত্র ব্যবহারে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন এবং প্রশিক্ষণে সবার মধ্যে সেরা হিসেবে বিবেচিত হন।
গেরিলা অভিযান ও যুদ্ধ
প্রশিক্ষণ শেষে আশালতা বৈদ্য এবং তার সহযোদ্ধারা বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিতে শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলাবাড়ি যুদ্ধ, হরিনাহাটি যুদ্ধ এবং রামশীল পয়সার হাটের যুদ্ধসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষে অংশগ্রহণ করেন। এসব যুদ্ধে নারী গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।এক পর্যায়ে হেমায়েত উদ্দিনের নির্দেশে আশালতার নেতৃত্বে ২৪ জন নারী সদস্যকে নিয়ে একটি বিশেষ কমান্ডো দল গঠন করা হয়। এই দলের প্রধান দায়িত্ব ছিল শত্রুপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা, ছদ্মবেশে গেরিলা আক্রমণ চালানো এবং প্রয়োজন হলে আত্মঘাতী মিশনেও অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা। দলের সদস্যরা সবসময় দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন।
রামশীল নদীর তীরে একবার পাকিস্তানি বাহিনী এবং রাজাকারদের একটি দল লঞ্চে করে এলাকায় প্রবেশ করে। সেই সময় আশালতা ও তার সহযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষ চলে এবং প্রায় তিন ঘণ্টারও বেশি সময় যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারাই বিজয় অর্জন করেন এবং শত্রুপক্ষকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আশালতা বৈদ্য শুধু ছোটখাটো গেরিলা অভিযানেই অংশ নেননি, বরং গোপালগঞ্জ অঞ্চলে সংঘটিত প্রায় ২২টি বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রূষার কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি মানবিক দায়িত্ব পালনেও ছিলেন সমান সক্রিয়।
স্বাধীনতার পরের জীবন
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আশালতা বৈদ্য ও তার সহযোদ্ধারা যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পুনর্বাসনে কাজ শুরু করেন। শরণার্থী হয়ে যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনার কাজে তিনি এবং তার দল সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।স্বাধীনতার পর তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেন।
১৯৮০-এর দশকে নারীদের উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “সূর্যমুখী সংস্থা” নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তিনি এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোনো খেতাব বা উপাধি পাননি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আশালতা বৈদ্যের মতো অনেক সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধার অবদান আজও যথেষ্ট আলোচিত নয়। অথচ তাদের ত্যাগ, সাহস ও আত্মনিবেদন দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব অজানা কাহিনি তুলে ধরা ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
কার্টেসি: গিরিধর দে/ বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র।
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: বর্তমান সময়
...