ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারত বন্দর দিচ্ছে না

Sanatan Patra
ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে বন্দর দিচ্ছে না ভারত
ভারত যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনী বন্দর ইরান যুদ্ধ ইস্যু
Sonatanpatro News
সনাতন পত্র ডেস্ক
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন
ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহারের জন্য দেশটির কোনো বন্দর ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি এবং ভবিষ্যতেও এমন কোনো অনুমতিও দেওয়া হবে না । সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যমে যে দাবি ছড়ানো হয়েছে যে, মার্কিন নৌবাহিনী ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করছে বা করতে পারে — সেসব তথ্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, গুজব এবং মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছে মোদী সরকার ।

বুধবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে —এমন দাবি অবাস্তর ও ভিত্তিহীন। এই ধরনের তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে বিভ্রান্ত করার জন্য এমন প্রচারণা চালানো হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে ভারত সরকার।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিবের উপদেষ্টা ডগলাস ম্যাকগ্রেগর একটি আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেলের আলোচনায় মন্তব্য করেন যে, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে ভারতীয় সমুদ্রবন্দরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ম্যাকগ্রেগরের এই মন্তব্য দ্রুত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই মনে করতে শুরু করেন যে, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মধ্যে ভারত হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিকভাবে সমন্বয় করছে। তবে নয়াদিল্লি দ্রুত সেই জল্পনা নাকচ করে দেয় এবং স্পষ্ট করে জানায় যে ভারত এখনো নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, আন্তর্জাতিক সংঘাতের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে তাই যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।

ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তা বিশ্ব রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের একটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা যায়। এই হামলার পর থেকেই পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।

হামলার জবাবে ইরানও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায়। তেহরান দাবি করে যে, তারা ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের এই পাল্টা হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিলতার দিকে এগুচ্ছে।

এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ভারত কোন অবস্থান নেবে তা নিয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। কারণ ভারতের সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশেরই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানে রাখার চেষ্টা করে আসছে ভারত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ভারতের জ্বালানি, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্পেও গুরুত্বপূর্ণ ।

বিশেষ করে ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে ভারতের বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। এই বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারত আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছেে। ফলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার মতো কোনো পদক্ষেপ নিবে না ভারত।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে যে, শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন সাবমেরিন হামলার একটি ঘটনা নিয়ে ভারত গভীরভাবে নজর রাখছে।

জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি যুদ্ধজাহাজটি সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করেছিল। মহড়া শেষে জাহাজটি নিজ দেশে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি সমুদ্র এলাকায় হামলার শিকার হয়। এই ঘটনার পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই ঘটনার বিষয়ে তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে এই হামলার সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত বর্তমানে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কও অক্ষুণ্ণ রাখতে চায় দেশটি।

এই পরিস্থিতিতে ভারত সম্ভবত এমন একটি অবস্থান নিতে চাইছে যাতে কোনো পক্ষের বিরোধিতার মুখে পড়তে না হয়। তাই সামরিক সহযোগিতা বা বন্দর ব্যবহারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে স্পষ্টভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান ঘোষণা করেছে ভারত।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের এই অবস্থান নতুন কিছু নয়। অতীতেও বিভিন্ন বৈশ্বিক সংঘাতে ভারত সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থিতিশীল অঞ্চলে ভারত সাধারণত সংঘাত এড়িয়ে চলার নীতি অনুসরণ করে।

ভারতের সাম্প্রতিক বিবৃতি থেকে স্পষ্ট যে দেশটি এখনো সংঘাতে জড়াতে চায় না। বরং পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিতে চায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উত্তেজনা বাড়লেও ভারত আপাতত কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার পথেই এগোচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ভারতের এই ঘোষণার মাধ্যমে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে ভারত তার ভূখণ্ড বা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে না।
প্রকাশ: ৫ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৫ মার্চ ২০২৬
India rejects claims of allowing US Navy to use Indian ports amid Iran conflict. ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে ভারত।
India rejects US Navy port use claim amid Iran conflict | ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে বন্দর দিচ্ছে না ভারত
India Iran conflict, US Navy India port, Douglas Macgregor claim, India neutral stance Iran war, ভারত যুক্তরাষ্ট্র বন্দর, ইরান ইসরায়েল সংঘাত, ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান
...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top