উপবৃত্তি পেতে ৮০% উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, নতুন নির্দেশিকা জারি।

Sanatan Patra
উপবৃত্তি পেতে ৮০% উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, নতুন নির্দেশিকা জারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
সংবাদদাতা
সনাতন পত্র ডেস্ক
শিক্ষা প্রতিবেদন
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য চালু থাকা উপবৃত্তি কর্মসূচিতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী এখন থেকে উপবৃত্তি পেতে হলে শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে বিদ্যালয়ের মোট পাঠদিবসের অন্তত ৮০ শতাংশ উপস্থিতি থাককতে হবে। একই সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব বিধান যুক্ত করে প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা–২০২৬ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছিল, অনেক শিক্ষার্থী উপবৃত্তির তালিকায় থাকলেও নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকছে না। নতুন নিয়মের মাধ্যমে এই অনিয়ম কমানো এবং প্রকৃত শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী যদি কোনো মাসে মোট পাঠদিবসের ৮০ শতাংশ উপস্থিতি ব্যর্থ হয়, তাহলে ওই মাসের জন্য তার উপবৃত্তির অর্থ পাবে না। তবে পরবর্তী সময়ে উপস্থিতির শর্ত পূরণ করতে পারলে শিক্ষার্থী আবারও উপবৃত্তির আওতায় আসতে পারবে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থী যদি ধারাবাহিকভাবে তিন মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে, তার উপবৃত্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের মাধ্যমে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং পরে পরিস্থিতি বিবেচনা করে পুনরায় উপবৃত্তি চালু করা হবে।

নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষার্থীকে অবশ্যই পূর্ববর্তী শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে পরবর্তী শ্রেণিতে উপবৃত্তির সুবিধা পাবে না। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীর ন্যূনতম বয়স হতে হবে চার বছর। এই বয়সসীমা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষার্থীদের অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, উপবৃত্তির অর্থ গ্রহণের জন্য অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর থাকতে হবে। সেই নম্বরের মাধ্যমে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে এবং সেই অ্যাকাউন্টে সরাসরি উপবৃত্তির টাকা পাঠানো হবে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয় এবং শিশুকল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই কর্মসূচির আওতায় থাকবে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তির সুবিধা পাবে। সরকার পরিচালিত জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি চালু রয়েছে।

উপবৃত্তির অর্থ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুলব্যাগ, স্কুল ড্রেস, জুতা, ছাতা, টিফিন বক্সসহ অন্যান্য শিক্ষা সহায়ক উপকরণ। এই সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত হবে।

নির্দেশিকায় শ্রেণিভেদে এবং পরিবারের শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে উপবৃত্তির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক উপবৃত্তির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫ টাকা। তবে পরিবারের শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী মোট অর্থের পরিমাণ ভিন্ন হবে।

প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরিবারের একজন শিক্ষার্থী থাকলে মাসে ১৫০ টাকা দেওয়া হবে। যদি একই পরিবারের দুইজন শিক্ষার্থী এই স্তরে অধ্যয়ন করে, তাহলে মাসিক উপবৃত্তির পরিমাণ হবে ৩০০ টাকা। অন্যদিকে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীর জন্য মাসে ২০০ টাকা এবং দুইজন শিক্ষার্থীর জন্য ৪০০ টাকা দেওয়া হবে।

একটি পরিবারের সর্বোচ্চ দুইজন শিক্ষার্থী এই উপবৃত্তির সুবিধা পাবে। এর বেশি শিক্ষার্থী থাকলেও অতিরিক্ত কেউ এই কর্মসূচির আওতায় আসবে না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমিত বাজেটের মধ্যে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী এই কর্মসূচির আর্থিক কাঠামো পরিবর্তন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন নির্দেশিকা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়বে এবং পড়াশোনায় মনোযোগও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে উপবৃত্তির অর্থ প্রকৃত শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাবে। এতে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ঝরে পড়ার হার কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অনেক অভিভাবকও এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করলে শিশুরা পড়াশোনায় আগ্রহী হবে এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।

শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, তথ্য যাচাই এবং উপবৃত্তি বিতরণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে। অনলাইন তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা জটিলতা না ঘটে।
ক্রম উপবৃত্তি পাওয়ার শর্ত বিস্তারিত নির্দেশনা
০১ বিদ্যালয়ে উপস্থিতি প্রতি মাসে মোট পাঠদিবসের অন্তত ৮০ শতাংশ উপস্থিতি থাকতে হবে
০২ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ পূর্ববর্তী শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে
০৩ প্রাক-প্রাথমিক বয়স প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি শিক্ষার্থীর ন্যূনতম বয়স ৪ বছর হতে হবে
০৪ জন্মনিবন্ধন শিক্ষার্থীর অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ থাকতে হবে
০৫ অভিভাবকের তথ্য অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর থাকতে হবে
০৬ মোবাইল ব্যাংকিং অভিভাবকের নামে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে
০৭ অনুপস্থিতি নিয়ম কোনো শিক্ষার্থী টানা তিন মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে উপবৃত্তি সাময়িক স্থগিত হবে
০৮ পরিবারের শিক্ষার্থী সংখ্যা একটি পরিবারের সর্বোচ্চ দুইজন শিক্ষার্থী উপবৃত্তির সুবিধা পাবে

সামগ্রিকভাবে নতুন নির্দেশিকার মাধ্যমে উপবৃত্তি কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর এবং শিক্ষাবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা সহায়ক সুবিধা প্রদান করার মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়েই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রকাশ: ৬ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: এখন সময়
৮০ শতাংশ উপস্থিতি, জন্মনিবন্ধন ও এমএফএস অ্যাকাউন্টসহ নতুন শর্তে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেবে সরকার। জেনে নিন বিস্তারিত নিয়ম।
উপবৃত্তি পেতে ৮০% উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, নতুন নির্দেশিকা জারি
প্রাথমিক উপবৃত্তি ২০২৬, stipend rules Bangladesh, primary education stipend, ৮০ শতাংশ উপস্থিতি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর
...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top