ঐক্যের বার্তা দিলেন তারেক রহমান

Sanatan Patra
তারেকের ঐক্যের বার্তা, দেশ গড়ার ডাক
নির্বাচন–পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন তারেক রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এসে ঐক্য ও দায়িত্বশীলতার বার্তা দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বলরুমে শনিবার বিকেলে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এখন আর বিভাজনের সময় নয়, দেশ গড়ার সময়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সব রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলার মধ্যেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশে রেখে সম্ভাব্য সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে প্রাথমিক দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং সেই রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা হবে।

দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের পরও নেতাকর্মীদের সংযত থাকার নির্দেশ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিজয় উদ্‌যাপন যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন না ঘটায়। নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে প্রতিহিংসা বা সহিংসতার কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, নতুন সরকার প্রতিশোধ নয়, পুনর্গঠন ও সংস্কারের পথে হাঁটবে।

দেশবাসীর উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় ঐক্যই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও রাষ্ট্রের প্রশ্নে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ভোটের মাধ্যমে জনগণ যে আস্থা প্রকাশ করেছে, তা রক্ষা করাই হবে নতুন সরকারের প্রধান দায়িত্ব।

সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতেও নির্বাচনব্যবস্থা আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। নির্বাচনী সংস্কার অব্যাহত থাকবে বলেও জানান।

সংবাদ সম্মেলনের একপর্যায়ে দেশি–বিদেশি সাংবাদিকেরা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। ভারত, পাকিস্তান ও চীনের গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা সম্ভাব্য সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থই হবে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু। আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দাঁড়াবে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়ন করা হবে। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এমন হবে না, যাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বহুপাক্ষিক ফোরামে সক্রিয় ভূমিকা রেখে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

নির্বাচনের ফলাফলের চিত্র তুলে ধরে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ২৯৭টি আসনের মধ্যে দলটি ২০৯টিতে জয় পেয়েছে এবং স্থগিত থাকা দুটি আসনেও তাদের প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। শরিক দলগুলোর প্রাপ্ত আসন যুক্ত হলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও সুদৃঢ় হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসনে জয় পেয়েছেন, যা সংসদে কার্যকর বিতর্কের সুযোগ তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অর্থনীতির বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা হবে অগ্রাধিকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা, রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি জানান, বাজেট প্রণয়নের আগে ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না। প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে গিয়ে জনগণের ভোগান্তি কমানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে কোথাও যাতে বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সে বিষয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণ শান্তি চায়, স্থিতিশীলতা চায়—এই প্রত্যাশা পূরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে।

তরুণ ভোটারদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, দেশের উন্নয়নে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়ন এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। সংসদকে কার্যকর বিতর্কের মঞ্চে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী মতকে সম্মান জানানোই হবে গণতান্ত্রিক সরকারের বৈশিষ্ট্য।

সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে তারেক রহমান আবারও ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, নির্বাচন শেষ হয়েছে, এখন দায়িত্ব শুরু। ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। উন্নয়ন, সুশাসন ও গণতন্ত্র—এই তিন ভিত্তির ওপর নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই সংবাদ সম্মেলনে দেশি–বিদেশি গণমাধ্যমের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে সম্ভাব্য সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান ঐক্য, সংযম ও বাস্তবভিত্তিক নীতির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এখন নজর থাকবে সরকার গঠন ও মন্ত্রিসভা ঘোষণার দিকে।

...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top