ঢাকা: আধুনিক কর্মজীবনে কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা ক্রমেই চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। দ্রুতগতির অর্থনীতি ও প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশে অনেক কর্মীকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হচ্ছে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নির্দিষ্ট সীমার বাইরে কাজের সময় বাড়ালে তা কর্মীর স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা—উভয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে সাধারণত সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দৈনিক আট ঘণ্টা কাজকে প্রচলিত কর্মসূচি হিসেবে ধরা হয়। সাপ্তাহিক ছুটিসহ এই ব্যবস্থায় মোট কর্মঘণ্টা দাঁড়ায় প্রায় ৪৮ ঘণ্টা। যদিও বিশ্বব্যাপী কর্মঘণ্টার কাঠামো একরকম নয় এবং দেশভেদে এতে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ বাস্তবে যত ঘণ্টা কাজ করেন, তা সব সময় আদর্শ বা উপযোগী সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পেশার ধরন, আয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে কর্মঘণ্টার গ্রহণযোগ্য সীমা পরিবর্তিত হয়। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপকদের কর্মঘণ্টা সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের নেতৃত্ব ও অগ্রাধিকারের প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হয়।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বে কর্মরত প্রাপ্তবয়স্কদের গড় সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা প্রায় ৪২। লিঙ্গ, বয়স, পেশা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তর অনুযায়ী এই গড় সময়ের ভিন্নতা থাকলেও, অনেক দেশেই ৪০ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ এখনো একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজ–জীবনের ভারসাম্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের বহু কর্মী কিছুটা আয় কম হলেও বেশি অবসর সময় পেতে আগ্রহী। জার্মানিতে আদর্শ কর্মসপ্তাহ প্রায় ৩৭ ঘণ্টা হিসেবে ধরা হয়।
এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে অনেক কর্মী তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় কাজ করতে আগ্রহ দেখান, যার পেছনে আয়ের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা ভূমিকা রাখে বলে গবেষকেরা মনে করেন।
উৎপাদনশীলতার প্রশ্নে গবেষণার ফল আরও স্পষ্ট। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। আর ৬০ ঘণ্টার বেশি কাজ করলেও সামগ্রিক উৎপাদন আর তেমন বাড়ে না। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় কাজ মানেই বেশি ফল—এ ধারণা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়।
প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন কর্মী নিয়োগের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় জড়িত থাকে। এ কারণে অনেক সময় বিদ্যমান কর্মীদের কর্মঘণ্টা বাড়ানো তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মনে হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কর্মীর ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে এর আর্থিক ও মানবিক ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় দীর্ঘ শিফট মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে। জরুরি সেবা খাতে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, শিফটের শেষ দিকে কর্মীদের প্রতিক্রিয়া সময় ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়, যা কখনো কখনো প্রাণনাশের ঝুঁকি তৈরি করে।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আদর্শ কর্মসপ্তাহ ঘণ্টার হিসাবে নয়, বরং কাজের আউটপুট ও গুণগত মানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কেউ কেউ মনে করেন, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে কর্মঘণ্টা সংক্রান্ত ধারণাই আমূল পরিবর্তিত হতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কর্মঘণ্টা নিয়ে ব্যবস্থাপকদের সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক বাস্তবতা নয়, তাদের মূল্যবোধ ও অগ্রাধিকারকেও তুলে ধরে।