নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ: অর্থনীতিতে গতি ও স্থিতিশীলতা

Sanatan Patra
Bangladesh Economy
Sonatan Patra Logo
নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৪
নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সময়ের পর পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক কাঠামোতে ফিরে এসেছে দেশ। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, গত ১৮ মাসে দেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট স্থবিরতা দেখা গেছে। প্রবৃদ্ধির হার কমেছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বেকার। ব্যবসা-বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা ছিল। সামাজিক অস্থিরতা ও সহিংসতার প্রভাব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পড়েছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে তিনটি বড় প্রত্যাশা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

প্রথমত, অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে গতি ফেরাতে হবে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে এবং মানুষের আয় বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতি নয়, সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে হবে। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। কেবল করছাড় বা প্রণোদনা যথেষ্ট নয়—নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি। ঋণের চাপও উদ্বেগজনক। এই অসমতা কমাতে ব্যয়সংযম, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।

সুষম উন্নয়ন নিয়েও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, উন্নয়নের দুইটি মাত্রা রয়েছে—সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমতা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য। আয়, সম্পদ ও সুযোগের অসমতা বেড়েছে। দেশে তিন কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে বাস করছে এবং প্রায় ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই চিত্র সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

আঞ্চলিক বৈষম্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার আশপাশ বা দক্ষিণাঞ্চলের তুলনা করলে অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে পার্থক্য স্পষ্ট। বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অঞ্চলভিত্তিক ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের বড় দায়িত্ব। গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যাংক অনুমোদন, পরিচালনা পর্ষদে স্বজনপ্রীতি এবং ঋণ খেলাপির ঘটনা বেড়েছে। ফলে আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
সেলিম জাহান বলেন, আর্থিক খাতে বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন বিদ্যমান। সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের ঋণ বিতরণ ও আদায়ের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। অনিয়মের দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া সুশাসন ফিরবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল। বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের বিবেচনার জন্য রাখা হয়। অর্থনীতিবিদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে আর্থিক খাতে টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়। মুদ্রানীতি নির্ধারণ, ব্যাংক তদারকি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কাঠামো প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—অর্থনীতিতে গতি ফেরানো এবং একই সঙ্গে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বিত নীতিই পারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। মানুষের প্রত্যাশা এখন কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান ফলাফল।
...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top