একাত্তর অনলাইন ডেস্ক
ইরানের রাজধানী তেহরানের ব্যস্ত রাজপথে টানানো একটি বিশাল ব্যানার মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে। ওই ব্যানারে ইরান আক্রান্ত হলে ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ব্যানারটি প্রকাশ্যে আসার পর একদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তেহরানের প্যালেস্টাইন স্কয়ার এলাকায় প্রদর্শিত ওই ব্যানারে একটি মানচিত্রের মাধ্যমে ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখানো হয়েছে। মানচিত্রে বেন-গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, তেলআবিবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর কিরিয়া সদর দপ্তর, হার্জলিয়ার কাছে গ্লিলটে আইডিএফ ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেটের ঘাঁটি এবং আরও কয়েকটি সামরিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মানচিত্রে জেরুজালেমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ব্যানারটিতে একটি সামরিক কন্ট্রোল ডেস্কের চিত্রও রয়েছে, যেখানে উজ্জ্বল লাল রঙের ‘ফায়ার’ বোতাম, একটি যুদ্ধবিমান, দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, একটি রেডিও সেট এবং কিছু রাজনৈতিক নোট দেখানো হয়েছে। ব্যানারের শিরোনামে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে—‘You will start it… We will finish it’ (শুরু করবে তোমরা, শেষ করব আমরা)। তবে ব্যানারটির উৎস ও সরকারি অনুমোদনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এই ব্যানার প্রকাশের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। যদিও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি, তবে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করছে।
চলতি সপ্তাহেই ইরান ইস্যুতে আলোচনার জন্য নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। নেতানিয়াহু আগেই জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির শর্ত হিসেবে তেহরানকে অবশ্যই তাদের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর চাপের কৌশল আরও জোরদার করেছে। ট্রাম্প এমন একটি পারমাণবিক চুক্তি করতে চান, যাতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধের শর্ত থাকবে। একই সঙ্গে সামরিক চাপও অব্যাহত রেখেছেন তিনি। গত ৭ ফেব্রুয়ারি মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার ব্র্যাড কুপার আরব সাগরে অবস্থানরত রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ পরিদর্শন করেন, যা সামরিক প্রস্তুতির বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসন ইরানের চারপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপও জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ইরানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে এবং সতর্ক করেছে যে তারা গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ‘খুব চিন্তিত হওয়া উচিত’।
এই উত্তেজনার মধ্যেই গত ৩৭ বছরের মধ্যে এই প্রথম খামেনি বিমানবাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে বার্ষিক বৈঠকে উপস্থিত হননি। এমনকি কোভিড-১৯ মহামারির সময়েও তিনি এই বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কায় তিনি জনসমক্ষে উপস্থিতি কমিয়ে দিয়েছেন। তেহরান মূলত ২০২৫ সালের জুনের মতো একটি পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছে, যখন ট্রাম্প হামলার সিদ্ধান্ত নিতে দুই সপ্তাহ সময় দেওয়ার কথা বললেও মাত্র দুই দিনের মধ্যে ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যদি নতুন করে একটি পারমাণবিক চুক্তি হয়, তবে সামরিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। ওই চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
তবে চুক্তির পথ সহজ নয়। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার বিষয় নয়। বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান—কোনো চুক্তি হতে হলে তাতে অবশ্যই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে, তেহরানে টানানো এই ব্যানার শুধু একটি প্রতীকী হুমকি নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও শক্তির লড়াইয়ের একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: আরটি, ওয়াইনেট, সানডে গার্ডিয়ান ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম